রেজাউল করিম খোকন

  ১১ অক্টোবর, ২০২১

দৃষ্টিপাত

ঋণ আদায় প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবতে হবে

করোনায় ব্যাংক খাতের ঋণ আদায়ের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও নিয়মিত ঋণ থেকে এক টাকাও আদায় করতে পারেনি পাঁচটি ব্যাংক। আরো তিন ব্যাংকের আদায় ১ শতাংশেরও নিচে। করোনার সুযোগ নিয়েই এমনটি করেছেন অনেক ব্যবসায়ী। ফলে এক দিকে খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, অন্য দিকে আদায়ের নিম্নগতি ব্যাংক খাতকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলো অভ্যন্তরীণভাবে ১০ লাখ ১৯ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। বিশেষ ছাড়ে নিয়মিত থাকা এসব ঋণের বিপরীতে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আদায় হয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ১ লাখ ৮০ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। তবে আলোচ্য সময়ে ঋণ বিতরণ করলেও এক টাকাও আদায় করতে পারেনি পাঁচ ব্যাংক। জুন পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ছিল। কিস্তির ২৫ শতাংশ দিলেই গ্রাহককে নিয়মিত রাখতে নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কোনো টাকাই পরিশোধ করেনি পাঁচ ব্যাংকের কোনো গ্রাহক। সুযোগ নিয়েছে সবাই। ফলে জুনে আদায়ের হার শূন্য শতাংশ।

অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১৯ ব্যাংকে খেলাপি গ্রাহক থেকে আদায়ের চিত্র খুবই করুণ। এগুলোর আদায়ের হারও ১ শতাংশের নিচে। সবমিলিয়ে খেলাপি গ্রাহক থেকে ২৩টি ব্যাংকের আদায়ের হার শূন্য থেকে ১ শতাংশের মধ্যে। জুন শেষে ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৫ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে ব্যাংকগুলো আদায় করতে সক্ষম হয়েছে ১ হাজার ৭৯৫ কোটি। সুতরাং সার্বিক আদায় হার ১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। করোনাকালে ঋণ পরিশোধে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল। সেই সুযোগে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কিস্তি শোধ করেনি অনেকে। তবে চলতি বছরে কিছু টাকা আদায় হয়েছে, যার পরিমাণ অতি নগণ্য। বেশির ভাগ মানুষ হাতে টাকা রেখে দিতে চাচ্ছেন, কারণ প্রয়োজনীয় চলতি মূলধনের টাকায় কিস্তি দিলে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তাই সবাই ঋণ পরিশোধে বিমুখ ছিলেন। তা ছাড়া করোনার প্রভাব ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় ঋণ পরিশোধের বড় সুবিধা পাওয়ার একটা গুঞ্জন চলছিল। সেই সুবিধা পেতে ইচ্ছাকৃতভাবেই তখন তারা ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করেননি। এটা অস্বাভাবিক ঘটনা। একই সঙ্গে উদ্বেগেরও। এভাবে ঋণ আদায় বন্ধ হয়ে গেলে তা হবে ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনিসংকেত। যত সমস্যা থাকুক পুরোপুরি ঋণ আদায় কখনো বন্ধ থাকার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বসা উচিত। কেন এমন হলো জানা দরকার। সমস্যা শনাক্ত করে তা সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করতে নানা ফন্দি করেন। এরমধ্যে করোনাভাইরাস শুরুর পর গণছাড় নিয়ে ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধ না করার নতুন একটি পক্ষ তৈরি হয়েছে। সামর্থ্য থাকলেও তারা ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। অনেকের রপ্তানি বিলের অর্থ দেশে এলেও পুরো পাওনা পরিশোধ না করে ছাড়ের সুযোগ নিচ্ছেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার কারণে তাদের খেলাপি করা যাচ্ছে না। আবার নতুন ঋণসহ ব্যাংকিং সুবিধা দিতে হচ্ছে। এ অবস্থা দীর্ঘ হলে ব্যাংকগুলো নগদ প্রবাহের সংকটে পড়বে। ফলে ঢালাও সুবিধা না দিয়ে কেস টু কেস ভিত্তিতে সুবিধা দিলে ব্যাংক খাতের জন্য ভালো হতো।

দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দেশে চলছে করোনার প্রকোপ। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া লকডাউন, বিধিনিষেধে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। বড় থেকে ছোট অনেক শিল্প কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হয়েছে আর্থিক দুর্যোগ। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অর্থনীতির অধিকাংশ খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেক শিল্প, সেবা ও ব্যবসা খাত তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক কর্মকা- পুনরুজ্জীবিতকরণ, শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে বহাল এবং উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রবর্তন, পুনঃঅর্থায়ন স্কিমসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ব্যাংক খাতে তারল্য সরবরাহ নিশ্চিতকল্পে বিভিন্ন ধরনের নীতি সহায়তাও দেওয়া হয়।

এদিকে করোনার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত আর্থিক প্রণোদনার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি সঞ্চার, ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক কর্মকা-ের গতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। তবে অনেক ব্যবসায়ী কম সুদের এই ঋণ নিয়ে অন্য ব্যাংকে তাদের অন্যান্য ঋণ শোধ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেউ কেউ আবার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন, আবার কেউ ফ্ল্যাট কিনেছেন ও অন্যান্য ব্যবসায় খাটিয়েছেন। খেলাপিদের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ব্যাংকের অন্যতম কাজ হলো দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার চাকা সচল রাখতে ঋণ দেওয়া এবং সময়মতো সে ঋণ আদায় করা। ব্যাংকের প্রধান সম্পদই হলো এ ঋণ। যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে অনিয়ম রেখে সুষম উন্নয়ন ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দেশে চলছে করোনার প্রকোপে বেসরকারি বিনিয়োগে অনেকটাই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের অনেকেই ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছেন না। নাম লেখাচ্ছেন ঋণখেলাপির তালিকায়। মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। কম পুঁজির এসব ব্যবসায়ীর অনেকে অর্থ অভাবে নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারছেন না। ফলে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের টাকাও নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছেন না। যার প্রভাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। ঋণ আদায় কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন ঋণ বিতরণেরও নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় ব্যাংকের আয়ও কমে যাচ্ছে। তবে পরিচালন ব্যয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অফিস ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন খরচ বাড়ছে।

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চায় এফবিসিসিআই। ব্যবসায়ীদের এই শীর্ষ সংগঠনটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের বলেছে, যারা অভ্যাসগত ঋণখেলাপি, তাদের সঙ্গে এফবিসিসিআই নেই। ১ শতাংশের কারণে ৯৯ শতাংশ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। আবার অনেক অনিচ্ছাকৃত খেলাপিও আছেন। অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের সহায়তা দিতে হবে। সমৃদ্ধির নানা সোপান অতিক্রম করে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। নানা অর্জন বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের অভিশাপ বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমাদের ব্যাংকিং খাত শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারছে না খেলাপি ঋণের কারণে। হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বোঝা আমাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাঁধে চেপে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার পরও তাদের সেই সাফল্য ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতির এবং সমৃদ্ধির উজ্জল চিত্র আমাদের উল্লসিত করলেও আমাদের সব উচ্ছ্বাস থেমে যায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির অঙ্ক দেখলে। এ বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সবাই সচেতন এবং ওয়াকিবহাল। বিষয়টি সবাইকে বিব্রত করে, এ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন মহলে এবং ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দারুণ অস্বস্তি রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, সংসদীয় কমিটি নানা দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন খেলাপি ঋণের অভিশাপ ঘোচাতে। রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা, পরামর্শ অনুযায়ী তাদের ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি, পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর অর্জিত সাফল্য আশাব্যঞ্জক নয় বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। আমাদের দেশের বড় বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধ না করা এক ধরনের কালচার রয়ে গেছে। আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় তাদের মধ্যে এ প্রবণতা অব্যাহত আছে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও কলামিস্ট

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close