মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন

  ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

দৃষ্টিপাত

সফর মাসের ফজিলত ও আমল

ইসলামি হিজরি চান্দ্রবর্ষের দ্বিতীয় মাস সফর। আরবি ‘সিফর’ মূল ধাতু থেকে উদ্ভূত হলে ‘সফর’ মানে হলো শূন্য, রিক্ত। আর ‘সাফর’ ক্রিয়া মূল, সফর মাসের গুরুত্ব ও কিছু কথা আল্লাহতায়ালা উম্মাতে মুসলিমাকে অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে নিমজ্জিত করে রেখেছেন। তার অন্যতম নিয়ামত হলো দিন-রাত, মাস। রাত ও দিনের জন্য চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি করেছেন। এ চন্দ্র ও সূর্যকে তিনি বর্ষ গণনার মাধ্যম বানিয়েছেন। মানুষ সাধারণত অবস্থার সঙ্গে সময়কে মূল্যায়ন করে। আরব দেশে সে সময় সফর মাসে খরা হতো এবং খাদ্যাভাব, আকাল ও মন্দা দেখা দিত। মাঠঘাট শুকিয়ে বিবর্ণ তামাটে হয়ে যেত। ক্ষুধার্ত মানুষের চেহারাগুলো রক্তশূন্য ও ফ্যাকাশে হয়ে যেত। তাই তারা অবস্থার সঙ্গে মিল রেখে এই মাসের সঙ্গে একটি বিশেষণ যুক্ত করে বলত, ‘আস সাফারুল মুসাফফার’, অর্থাৎ ‘বিবর্ণ সফর মাস’- (লিসানুল আরব, ইবনু মানযুর (র.)। জাহেল আরবরা এই মাসকে দুঃখের মাস মনে করত, এমনকি তারা এ মাসের চাঁদ দেখা থেকে পর্যন্ত বিরত থাকত এবং দ্রুত মাস শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করত। ইসলামি বিশ্বাস মতে, সময়ের সঙ্গে কোনো অকল্যাণ নেই; কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ভর করে মানুষের বিশ্বাস ও কর্মের ওপর। তবে চন্দ্রের হিসাব আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়।

আরবি বছরের দ্বিতীয় মাস সফর। আল্লাহর সৃষ্টি প্রতিটি দিন-রাত-মাস-বছরই ফজিলতপূর্ণ। তাই সফর মাসও এর বাইরে নয়। আল্লাহতায়ালার রহমত, বরকত, কল্যাণ পেতে হলে এ মাসে বেশি বেশি নেক আমল করতে হবে। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত আদায়ের পাশাপাশি গভীর রজনীতে নফল ইবাদতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে প্রভুর দরবারে খালেছ নিয়তে কোনো কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা কবুল করেন। অনেকে এই মাসকে একটি দুঃখের মাস মনে করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে সফর মাস শেষ হওয়ার সুসংবাদ দেবে, আমি তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং সফর মাসের শিগগিরই অবসান কামনা করেছেন। তাই তো এ মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদাত করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতির সমুদয় অকল্যাণ থেকে মুক্ত থাকতে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতে হবে।

সফর মাসের হাদিসটির ব্যাপারে ইসলামি চিন্তাবিদরা দুটি মত তুলে ধরেছেন- প্রথমত, হাদিসটি সম্পূর্ণ জাল, মিথ্যা যা আদৌ রাসুলের হাদিস নয়, বরং যারা এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন তাদের কেউই হাদিস সংরক্ষণকারী নয়। দ্বিতীয়ত, হাদিসটি সহিহ্, তবে এ হাদিসের প্রেক্ষাপট কী তা জানতে হবে। মূলত হাদিসটি একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তা হলো- একবার হজরত আবু বকর ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দূরের এক জনপদে সফরে যান। সে সফর থেকে ফিরতে অনেক বিলম্ব হচ্ছিল। কোনো চিঠি বা সংবাদও আসছে না। এমতাবস্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রিয় সাহাবির জন্য চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ওই সময় একটি চিঠি এলো, তাতে লেখা ‘হে আল্লাহর রাসুল! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমি সফর মাস শেষে মদিনায় ফিরব। কিন্তু তখনো সফর মাসের বেশ সময় বাকি। তাই তিনি হজরত আবু বকরের অপেক্ষায় থাকাকালীন সফর মাস শেষের অপেক্ষায় থাকলেন- কখন সফর মাস শেষ হবে। তখন তিনি ওই হাদিসটি বলেছিলেন। তা ছাড়া এ মাসের ৬ অক্টোবর (বুধবার) পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা পালিত হবে।

সাধারণ মুসলমানরা এ দিনটিকে খুশির দিন হিসেবে উদযাপন করে। কিন্তু আখেরি চাহার সোম্বা কী? তা হয়তো অনেকেই জানেন না। অর্থাৎ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সফর মাসের শেষ দিকে প্রচ- অসুস্থ ছিলেন। সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি অনেকটা সুস্থতা লাভ করেন। এ খুশিতে অনেক সাহাবি বিভিন্নভাবে দান-সাদকা করেছেন। এ দান-সাদকা নিঃসন্দেহে উত্তম কাজ। তবে এমন কোনো হাদিস বা দলিল নেই যে, পরে সাহাবায়ে কেরাম এ দিনটি খুশির দিন হিসেবে উদযাপন করেছেন বা প্রতি বছর দান-সাদকা করেছেন। যেহেতু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকে শুরু করে সাহাবায়ে কেরামদের জামানায় ছিল না। তাই সে হিসেবে আখেরি চাহার সোম্বা ঘটা করে পালনের কোনো যৌক্তিকতা নেই।

প্রতি চন্দ্র মাসে নির্দিষ্ট কিছু আমল থাকে। সে আমলগুলো সফর মাসে করা যেতে পারে। ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে আইয়ামে বিদের তিনটি রোজার ইহতিমাম করা। প্রতি মাসে ৩টি সিয়াম পালন করার কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। হাদিসের ভাষ্য, আবদুল্লাহ ইবনে আ’মর ইবনে আ’স (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘প্রতি মাসে তিনটি করে সিয়াম পালন, সারা বছর ধরে সিয়াম পালনের সমান।’- (বুখারি : ১১৫৯, ১৯৭৫)। প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার অভ্যাস করা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুদিন বিশেষ রোজা রাখতেন। সর্বোপরি ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতে মুয়াক্কাদা যথাযথ পালন করার সঙ্গে সঙ্গে নফল দান সদকার প্রতি মনোযোগী হওয়া। আর আল্লাহ সৃষ্ট সব দিন-রাত-মাসের ফজিলত অত্যাধিক। আল্লাহতায়ালা আমাদের এ মাসের প্রত্যেকটি দিন-রজনীতে ফরজ ওয়াজিব আমলের পাশাপাশি নফল নামাজ, রোজা পালনসহ ইবাদাত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : এম এ কামিল হাদিস

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

[email protected]

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close