পর্যালোচনা

সামনে আরো কঠিন সময়

অরূপ তালুকদার

প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

করোনাকালের এই দুঃসময়ে কোনো কিছুর হিসাব মেলানোই যেন সবার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে এবং এই প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের প্রতিদিনের খাবার যেভাবে কষ্ট করে জোগাড় করতে হয়, খেটে খাওয়া মানুষদের অবস্থাও তদ্রপ। চীনের উহানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যখন শুরু হয়, তখন পৃথিবীর মানুষ বোঝেনি সামনে কি কঠিন দিন আসছে। এই চৈনিক ভাইরাস মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতে এই মহামারির ভয়াবহতা আমরা টের পেয়েছি। প্রথমে ভাবা হয়েছিল অল্পদিনের মধ্যে এই আজাব থেকে আমরা মুক্তি পেয়ে যাব। কিন্তু হলো কী? কাক্সিক্ষত মুক্তি আমাদের হয়নি। বরং দিনে দিনে আরো অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হয়েছি আমরা। এমনকি আগামীর দিনগুলো আমাদের জন্য আর কী কী দুঃসংবাদ বয়ে আনবে, তাও জানি না। তবে এটা বলতে পারি, করোনার অভিশাপ থেকে সহজে মানুষের মুক্তি মিলবে না। এর সঙ্গে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও অর্থনৈতিক সংকট ক্রমেই বাড়ছে।

হেলথ বিহেভিয়ারের প্রফেসর এডউইন ফিশার বলেছেন, কোনো ঘটনায় মানসিকভাবে ধাক্কা খাওয়ার পর তার ফলাফল ঘটনার ছয়-সাত মাস পর সামনে আসতে শুরু করে। তেমনি করোনার কারণেও আগমী দিনগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রধান স্থান হচ্ছে ঢাকা। করোনায় সারা দেশে যত মানুষের মৃত্যু বা আক্রান্ত হয়েছে। তার বেশির ভাগই ঢাকায়। কারণ ঢাকায় মানুষের বসবাস ও সমাগম সবচেয়ে বেশি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সারওয়ার আলী বলেছেন, ঢাকায় মানুষ বাড়লেও সেভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী সুলভ হয়নি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধিও তেমনভাবে মানছেন না সাধারণ মানুষ।

এদিকে আমাদের দেশে করোনার ভয়াবহতা অন্যান্য দেশের তুলনায় কমেছে বলে মনে হচ্ছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এখন পরিস্থিতি যতটা স্থিতিশীল বলে মনে হয়, আসলে এই স্থিতিশীলতা আগামী দিনে নাও থাকতে পারে। কারণ আমরা এখনো দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণের মুখোমুখি হইনি। সেই পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে আগামী শীতে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অনুদান প্রদানকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে প্রসঙ্গক্রমে করোনা মহামারি সম্পর্কে বলেন, ‘আগামী শীতে করোনার প্রকোপ আরো কিছুটা বাড়তে পারে। সেজন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। করোনা মোকাবিলায় সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। সেজন্যই হয়তো আমরা এটা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি।’

এখন প্রশ্ন হলো, সেই ধাক্কা সামলাতে যে সক্ষমতার প্রয়োজন হবে, তা কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? এটি একটি কঠিন প্রশ্ন বৈকি! অন্যদিকে, আমরা সরকারের দিক থেকে সর্বক্ষেত্রে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর তোড়জোড় দেখতে পাচ্ছি। তবে এ ছাড়া আমাদের আর তেমন কিছু করার আছে বলেও মনে হয় না। কারণ আমাদের এই জনবহুল দেশে, যেখানে এখনো কোটি কোটি মানুষ রয়েছে দারিদ্র্যসীমার নিচে, যেখানে জীবনের সঙ্গে জীবিকার প্রশ্নটিও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, সেখানে সরকারের পক্ষে কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে খাইয়ে পরিয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। যদিও এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রচেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষকে ব্যাপকহারে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখার চেষ্টা করেছেন। তবে প্রসঙ্গক্রমে এটাও বলা দরকার, আমাদের দেশের বিত্তশালীদের যদি নিজের দেশের প্রতি সত্যিকারভাবে ভালোবাসা থাকত, তাহলে আমাদের এই দেশটা আরো অনেক সুন্দর আর ভালো থাকতে পারত। তারা যে কতটা স্বার্থপর, অসৎ, কতটা দুর্নীতিবাজ তার প্রমাণ আমরা করোনাকালের দুঃসময়েও পেয়েছি।

আমরা সবাই জানি, করোনাকালের এই দুঃসময়ে দেশের বেশির ভাগ মানুষের আয় কমেছে। কিন্তু অন্যদিকে, সাধারণ মানুষদের অবাক করে দিয়ে নতুন করে বেড়েছে কোটিপতির সংখ্যা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ বছরের গত মার্চ মাস থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৩৪১২ জন ও ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬০৩৭ জনে ও গত মার্চ মাস পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ৮২,৬২৫ জন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেছেন, ‘দেশের কোটি কোটি মানুষ নিঃস্ব হয়েছে বলেই এই করোনাকালে ৩৫০০ জন মানুষ নতুন করে কোটিপতি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংক থেকে লুটপাট করে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ লুটেরা কোটিপতি হয়েছে, এরাই হয়তো বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে টাকা জমা রাখছে। এতে বোঝা যায়, এ সময় সাধারণ মানুষের আয় উপার্জন কমলেও ধনীদের আয় বেড়েছে ও এসব তারই ধারাবাহিকতা।’ উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে আমাদের দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ১৯১৬৩ জন।

প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) এক ওয়েবিনারে জানা যায়, করোনার কারণে ৭২.০৬ শতাংশ পরিবারের আগের চেয়ে আয় কমেছে এবং তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওআর এসব কারণেই আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কাজটি আরো কঠিনতর করে দিচ্ছে দেশের অতি মুনাফালোভী কিছু ব্যবসায়ী। তারা যেকোনো অজুহাতে দ্রব্যমূল্য নিয়ে খেলায় মেতে ওঠে। আর নাভিশ্বাস ছুটে সাধারণ মানুষের। সাম্প্রতিক সময়ে পেঁয়াজ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। হঠাৎ কী হলো কে জানে, ভারত থেকে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণা এলো। আর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশের কিছু অসৎ ব্যবসায়ী পেঁয়াজকে ধরে ফেললেন অতি মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে। রফতানি বন্ধের খবরটি জানা মাত্রই ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজের দর ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়িয়ে দিলেন ও আমরা সাধারণ মানুষরাও কম যাই না, খবর শোনা মাত্রই যে যেমন পেরেছে ৫ থেকে ১০ কেজি কিংবা তারও বেশি কিনে ফেলেছে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। কেননা পেঁয়াজ নিয়ে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়।

আসলে আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য কখনো কাটতে চায় না। কারণ যারা এ দেশের মানুষের ভাগ্য ফেরাবে, অর্থনীতিকে সচল রাখবে, সমাজের দুর্বল মানুষদের ভালো রাখবে, দেশের নারীর ক্ষমতায়ন ঘটাবে, তাদের বেশির ভাগই অন্য পথের পথিক, যারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এবং ভাগ্যের উন্নয়ন ছাড়া কিছুই বুঝতে চায় না। এদের অনেকের জন্য এ দেশের মানুষের মাথা নিচু হয়ে যায় অন্য দেশের মানুষের কাছে।

তবে যা কিছু নিয়েই ভাবিনা কেন চিন্তার মধ্যে ঢুকে থাকে করোনার ভয়। কান পেতে রাখি একটি ভালো খবর শোনার জন্য। ইতোমধ্যে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, কোভিড-১৯ ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ভ্যাকসিন এবং নিয়মিত চিকিৎসাকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ সহসা এই মহামারি শেষ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে এই মহামারিতে সারা বিশ্বে সাড়ে নয় লাখের ওপরে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছেন তিন কোটির ওপরে মানুষ। আশার কথা, চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই হয়তো পরীক্ষামূলকভাবে করোনার টিকার দুই কোটি ফড়ংব তৈরি করতে সমর্থ হবে যুক্তরাষ্ট্রের টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মডার্নও। ২০২১ সালের মধ্যে তারা ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ফড়ংব টিকা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

এদিকে, যদিও এন্টিজেন টেস্ট নিয়ে এখনো কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। তারপরও সব দিক বিচার-বিবেচনা করে সরকার অবশেষে কোভিড-১৯ ভাইরাসের জন্য সরকারি স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রগুলোতে এন্টিজেনভিত্তিক রেপিড টেস্টিংয়ের অনুমতি প্রদান করেছেন। আদেশে বলা হয়েছে, ‘সারা দেশে এন্টিজেন টেস্টের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অতি স্বল্পসময়ে কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের জন্য মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রস্তাবনা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণপূর্বক দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি পিসিআর ল্যাব এবং সব স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে এন্টিজেনভিত্তিক টেস্ট চালু করার অনুমতি দেওয়া হলো।’

এই টেস্টের ব্যাপারে ভাইরোলজিস্ট মেরিয়ান কোপম্যান বলেছেন, সাধারণত যাদের উচ্চমাত্রার ভাইরাস রয়েছে, যা অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে, তা দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে এন্টিজেন টেস্ট। প্রশ্ন হচ্ছে, টেস্টের ফলাফলে কী আসছে এবং তা কতটা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে তা সবার জানা প্রয়োজন।

লেখক : শব্দসৈনিক, লেখক ও সাংবাদিক

[email protected]

 

 

"