reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২২ ঘণ্টা আগে

অর্ণবের চোখে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন

‘যে পথে কেউ হাঁটে না, সে পথেই ইতিহাস লেখা হয়’- এমন মন্ত্রে বিশ্বাসী অর্ণব দাশ। সম্পূর্ণ নতুন ও চ্যালেঞ্জিং বিষয় ‘অপটোমেট্রি’ নিয়ে পড়তে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন ভারতের চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার স্বপ্ন কেবল নিজের ক্যারিয়ার গড়া নয়; বরং চক্ষুবিজ্ঞান নিয়ে দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়া। স্বপ্নবাজ এই তরুণের অনুপ্রেরণাদায়ক গল্পটি তুলে ধরেছেন আমানুর রহমান

ক্যারিয়ার হিসেবে অপটোমেট্রি বা চক্ষুবিজ্ঞান বেছে নেওয়ার পেছনে আপনার মূল অনুপ্রেরণা কী ছিল?

‘যে পথে কেউ হাঁটে না, সেই পথেই ইতিহাস লেখা হয়’- এই মন্ত্রে বিশ্বাস করেই আমি এক অচেনা পথে যাত্রা শুরু করেছিলাম। বাংলাদেশ থেকে যখন প্রথম অপটোমেট্রি নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিই, তখন বিষয়টি এ দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছেই ছিল সম্পূর্ণ অজানা। কেউ যখন জিজ্ঞেস করত, ‘কী নিয়ে পড়বে?’, আর আমি বলতাম ‘অপটোমেট্রি’, তখন প্রায়ই পাল্টা প্রশ্ন শুনতে হতো- ‘এটা আবার কী?’ তবে এই কৌতূহল বা অজ্ঞতা আমাকে নিরুৎসাহিত করেনি, বরং আমার সংকল্পকে আরো দৃঢ় করেছে। আমি উপলব্ধি করেছিলাম- এমন একটি ক্ষেত্রে আমার কাজ করা উচিত, যা এখনো অনেকের কাছে অপরিচিত হলেও মানবকল্যাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চোখ মানুষের পৃথিবী দেখার একমাত্র জানালা। অথচ এই অমূল্য জানালার যত্ন ও সুরক্ষায় আমাদের সচেতনতা এখনো খুবই সীমিত। স্কুলজীবন থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকার কারণে আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটি পেশা বেছে নেওয়া, যার মাধ্যমে সরাসরি মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা যায়। অপটোমেট্রি আমাকে শুধু চিকিৎসার সুযোগই দেয়নি, বরং জনসচেতনতা তৈরির এক বৃহৎ ক্ষেত্রও তৈরি করে দিয়েছে।

ভারতের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেতে আপনার প্রস্তুতি কেমন ছিল?

ভারতের একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য সহজ ছিল না। এর পেছনে ছিল সুদীর্ঘ ধারাবাহিক প্রস্তুতি, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ। আমি যখন প্রথম চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি, তখন বাংলাদেশ থেকে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া বেশ দুষ্কর ছিল। তথ্যের এই ঘাটতি আমি তীব্রভাবে অনুভব করেছি। তাই এখন বাংলাদেশ থেকে কোনো শিক্ষার্থী এ বিষয়ে জানতে চাইলে, আমি সাধ্যমতো তাদের সঠিক তথ্য ও দিকনির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।

ভারতের এই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকতে হলে কেবল মেধাই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন অসীম ধৈর্য, নিখুঁত সময় ব্যবস্থাপনা এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করার মানসিকতা। আমি প্রতিনিয়ত নিজের মধ্যে এই গুণগুলো গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি।

স্কলারশিপ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি কেমন ছিল এবং এটি আপনার শিক্ষাজীবনে কতটা সহায়ক হচ্ছে?

উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ পাওয়া আমার কাছে কেবল একটি আর্থিক সুবিধা নয়, বরং এটি একটি বড় দায়িত্ব। ভারতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান চণ্ডীগড় বিশ্ববিদ্যালয় মেধার ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত স্কলারশিপের সুযোগ দেয়। শুরুতে আর্থিক দিকটি মুখ্য মনে হলেও, এখানে আসার পর আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। এখানকার আন্তর্জাতিক মানের পড়াশোনার পরিবেশ এবং জ্ঞানের বিশাল পরিধি সত্যিই অতুলনীয়। প্রতিটি পরীক্ষা, প্রতিটি ক্লাস এবং প্রতিটি ছোট অর্জন আমাকে আমার দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস ও রোগীদের সাথে সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

তাত্ত্বিক পড়াশোনা ও বাস্তব প্রয়োগের চমৎকার সমন্বয়ই এই শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। ক্লাসরুমে শিক্ষকেরা যা শেখান, ল্যাবে বা হাসপাতালে সরাসরি রোগীদের ওপর তা প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছি। প্রতিদিন নতুন নতুন কেস, ভিন্ন ভিন্ন চোখের সমস্যা এবং সেগুলোর বৈজ্ঞানিক সমাধান- এই পুরো প্রক্রিয়াটি আমাকে একজন শিক্ষার্থী থেকে পেশাদার চক্ষুবিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তুলছে। বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিটি দিনই আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং পড়াশোনার চাপ কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?

অচেনা এক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটা শুরুতে বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। নতুন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি এবং পড়াশোনার তীব্র চাপ- সব মিলিয়ে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। শুরুর দিকে আমি হিন্দি ভাষা ঠিকঠাক বুঝতাম না, বলতেও পারতাম না। কিন্তু আমি দমে যাইনি। প্রতিদিন পরিবেশ থেকে শিখেছি, ভুল করেছি, আবার সেই ভুল শুধরে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছি। এই অভিযোজন ক্ষমতাই আমাকে মানসিকভাবে পরিপক্ব করেছে।

পড়াশোনা শেষে ভবিষ্যতে আপনি ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস নাকি গবেষণার দিকে যেতে চান?

ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস নাকি গবেষণা- ভবিষ্যতের পথটি কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি এবং আমার সেই স্বপ্ন বর্তমান বাস্তবতার চেয়েও অনেক বড়। আমার এই যাত্রার কেবল শুরু, পথচলা এখনো অনেক বাকি। আমার এই লড়াই কেবল নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নয়; এটি মূলত একটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর চেষ্টা। অপটোমেট্রি বা চক্ষুবিজ্ঞানের মতো একটি জরুরি বিষয়কে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই আমার লক্ষ্য। যেদিন ‘অপটোমেট্রি’ শব্দটি শুনে এ দেশের মানুষ আর অবাক হবে না, বরং এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে- সেদিনই মনে করব আমার এই দীর্ঘ পথচলা ও পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। আমি সেই নীরব পরিবর্তনের অংশ হতে চাই, যেখানে আজকের ছোট একটি সচেতনতা আগামী দিনে এক সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবীর বাস্তব রূপ নেবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়