শিক্ষার্থীদের চোখে আজও জাগ্রত জুলাই চেতনা
২৪-এর জুলাই আজও সবার হৃদয়ে চিরজাগরুক হয়ে আছে। এটি শুধু একটি মাসের নাম নয়; বরং এটি নতুন চেতনা, সাহস, ঐক্য ও পরিবর্তনের প্রতীক। সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু বদলে গেলেও জুলাইয়ের দীপ্ত চেতনা একইভাবে উজ্জ্বল, অনুপ্রেরণাময় ও জাগ্রত থাকবে। শিক্ষার্থীদের ভাবনা, অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশায় জুলাই এক অবিনাশী প্রেরণার নাম। সেই চেতনারই নানা দিক তুলে ধরেছেন ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী শেখ সুলতানা মীম

জুলাই : প্রতিবাদের মহাকাব্য
জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিবাদের প্রতীক। এই মাসে সংঘটিত গণআন্দোলন, আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম জাতির গণতান্ত্রিক চেতনা, অধিকারবোধ এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছে। অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার সাহসী অবস্থান ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় রচনা করেছে। প্রতিবাদের অগ্নিশিখা মানুষের অন্তরে ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাকে আরো সুদৃঢ় করেছে। রক্তঝরা আত্মত্যাগ, অবিচল সাহস এবং অদম্য প্রত্যয় জাতিকে ঐক্য, সংহতি ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছে। জুলাই তাই কেবল একটি মাসের নাম নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক অনির্বাণ প্রেরণা। এই মহাকাব্যিক সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামনে কোনো স্বৈরাচার, নিপীড়ন বা অবিচার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। নতুন প্রজন্মের কর্তব্য হলো এই চেতনা ধারণ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। জুলাইয়ের এই প্রতিবাদী চেতনা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনের এক অবিনাশী প্রেরণার উৎস।
আশিক মনজুর
ইংরেজি বিভাগ
ঢাকা কলেজ
স্বাধীনভাবে বাঁচার স্মৃতিস্তম্ভ জুলাই
জুলাই বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। এই মাস শুধু ক্যালেন্ডারের একটি সময় নয়; এটি স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম, সাহস এবং আত্মত্যাগের এক জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ। অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যখন মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, তখন জুলাই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের প্রতীক। অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও দৃঢ় মনোবল আমাদের শিখিয়েছে স্বাধীনতা কখনো ভিক্ষা করে নয়, সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জন করতে হয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে দেশজুড়ে সংঘর্ষ ও সহিংসতায় বহু মানুষ প্রাণ হারান এবং হাজারো মানুষ আহত হন। যাদের আত্মত্যাগ দেশের মানুষের মনে গভীর ছাপ রেখে গেছে। এই স্মৃতি নতুন প্রজন্মকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে এবং দেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। একই সঙ্গে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা কখনো সহজে অর্জিত হয় না; এর জন্য ত্যাগ, ঐক্য ও দৃঢ় সংকল্পের প্রয়োজন। তাই জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং এর শিক্ষা ধারণ করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসে জুলাই চিরকাল গৌরব, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে
থাকবে।
মুন্নি আক্তার নিশা
ব্যবস্থাপনা বিভাগ
মানবাধিকতা রক্ষা ও বজায় রাখা জুলাইয়ের শিক্ষা
মানবাধিকার ব্যক্তির স্বতন্ত্র অধিকার। মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি অধিকারকেই সাধারণত মানবাধিকার বলা হয়। ব্যক্তি হয়ে আমাদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা, তা বজায় রাখা, ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তির মহানুভবতা, অন্যের প্রতি নিজের দায়িত্ববোধ পালন করা প্রভৃতি সবকিছুই মানবাধিকারের মধ্যে পড়ে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ প্রতিটি নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার যা জুলাই বিপ্লবের সময় আমরা দেখতে পাই। জুলাই আমাদের মানুষের হয়ে মানুষের প্রতি অধিকার আদায়ের শিক্ষা দেয়। জুলাইয়ের সময় মানুষ তার ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য লড়াই করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত লড়েছিল। অবশেষে তারা বিজয় লাভ করে। এই শিক্ষা আমাদের মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। নিজ অধিকার নিয়ে আমাদের দায়বদ্ধতা এবং নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে সচেতন করার মানসিকতা তৈরি করায়। তাই জুলাইয়ের অন্যতম শিক্ষা হলো মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব ও অধিকার।
আফিয়া আলম
সমাজকল্যাণ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
জুলাই : অসীম প্রত্যাশার মহাসমুদ্র
জুলাই এসেছিল এক সমুদ্রসম প্রত্যাশা নিয়ে। বহু মানুষ বিশ্বাস করেছিল এবার বদলে যাবে চেনা বাস্তবতা, প্রতিষ্ঠিত হবে জবাবদিহিতা, শক্তিশালী হবে ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্র হয়ে উঠবে মানুষের। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি পরিবর্তনের মুহূর্ত ছিল না। এটি ছিল নতুন শুরুর এক প্রতিশ্রুতি। সকলের আশা ছিল নতুন বাংলাদেশের জন্ম। মানুষের চোখে ছিল স্বপ্ন, মনে ছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সময়ের আয়নায় দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন জাগে, সেই প্রত্যাশার কতটুকু পূরণ হয়েছে? পরিবর্তনের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল তার বড় অংশ এখনো কাগজের পাতায় বন্দি। মুখ বদলেছে, বক্তব্য বদলেছে, কিন্তু ব্যবস্থার পুরোনো চিত্র অনেক জায়গায় একই রয়ে গেছে। মানুষ অপেক্ষা করেছে দৃশ্যমান পরিবর্তনের জন্য। অপেক্ষা করেছে প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দেখার জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষা যেন শেষ হওয়ার নাম নিচ্ছে না। ইতিহাস বলে আত্মত্যাগের মূল্য শুধু স্মরণসভা আর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে তার অর্থ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়। জুলাইয়ের চাওয়া ছিল অসীম। সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করানোর দায়িত্ব এখন আমাদের সবার কাঁধে।
হিমেল আহমেদ
হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা
ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; কখনো কখনো তা আমাদের চোখের সামনেই রচিত হয়। জুলাইয়ের দিনগুলো আমার জীবনে তেমনই এক স্মরণীয় অধ্যায়। চারদিকে ছিল উত্তেজনা, সংগ্রাম আর প্রতিবাদের গর্জন। আমি সরাসরি মিছিলে না থাকলেও মনে হয়েছিল, এই লড়াই শুধু তাদের নয়, আমারও। তাই ঘরে বসে না থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিই। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য পানি, শুকনো খাবার, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দিই। তাদের মুখে স্বস্তি দেখে মনে হয়েছিল, আমার ছোট্ট সহায়তাটুকুও অর্থবহ। হঠাৎ চারদিকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ শুরু হয়, বাতাস ধোঁয়ায় ভরে যায়। আমিও সেই ধোঁয়ার মধ্যে আটকে পড়ি। ঠিক তখনই কয়েকজন মেয়ে, যাদের কিছুক্ষণ আগেই আমি সাহায্য করেছিলাম, ছুটে এসে আমাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। সেই মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিলাম সংগ্রাম শুধু প্রতিবাদের ভাষা নয়, এটি মানবতা ও সহমর্মিতারও প্রতীক। সেদিনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, ইতিহাস শুধু পড়ার বিষয় নয় তা অনুভব করারও বিষয়। জুলাই আমার কাছে তাই সাহস, মানবিকতা ও আত্মত্যাগের এক চিরন্তন শিক্ষা।
মায়মুনা
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ
"









































