তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশে করো’র চার বছরের অভিযাত্রা
বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষার্থীর সফলতার জন্য শুধু একাডেমিক ফলাফলই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন, নেতৃত্বের গুণাবলি, কার্যকর যোগাযোগ এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্কিং। পড়াশোনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে একজন তরুণ কীভাবে নিজেকে আরো দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও নেতৃত্বদানে সক্ষম হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তারই অনন্য উদাহরণ ইন্টারন্যাশনাল নন প্রফিট অর্গানাইজেশন ঈঅজঙ। গত চার বছরে ঈঅজঙ দেশবিদেশের অসংখ্য তরুণকে স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত এবং পেশাগত বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। এই সংগঠনের ভলান্টিয়াররা কীভাবে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরি এবং নেতৃত্বের বিকাশ ঘটিয়েছেন, সেই গল্প ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন CARO এর কমিনিউকেশন ডিপার্টমেন্টের ইর্টাণ তরুণ লেখক মো. মেহেরাব হোসেন রিফাত

বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় কারো’র পিস ইনিশিয়েটিভ
শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিষয়ে আমার একাডেমিক শিক্ষাকে সমাজের বাস্তব প্রয়োজনে প্রয়োগ করার ভাবনা থেকেই কারো (ঈঅজঙ) এর অধীনে পিস ইনিশিয়েটিভ এর যাত্রা শুরু। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য তরুণদের মধ্যে শান্তি, সহনশীলতা, সংলাপ ও মানবিক নেতৃত্বের চর্চা গড়ে তোলা এবং তাদের ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে প্রস্তুত করা। শান্তি শিখি, শান্তিতে বাঁচি, শান্তির নেতৃত্ব দিই এই দর্শনকে সামনে রেখে পিস ইনিশিয়েটিভ তরুণদের শুধু নেতৃত্ব শেখায় না; বরং প্রচলিত নেতৃত্বকে শান্তির নেতৃত্বে, স্বেচ্ছাসেবাকে শান্তি-স্বেচ্ছাসেবায় এবং পরিবর্তনকামী তরুণদের শান্তি নির্মাতায় রূপান্তরের একটি নতুন ধারা তৈরি করছে। আমরা বিশ্বাস করি, সমাজের অসংখ্য তরুণ ইতোমধ্যেই শান্তির জন্য কাজ করছে শিক্ষা, মানবিক সহায়তা, সামাজিক উদ্যোগ কিংবা স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে। পিস ইনিশিয়েটিভ তাদের সেই কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সমন্বিত শান্তি-দৃষ্টিভঙ্গির আওতায় নিয়ে আসতে চায়। ব্যক্তি জীবনের আত্মশান্তি থেকে শুরু করে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক পরিসরে শান্তি প্রতিষ্ঠার চিন্তাকে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একাধিক অনলাইন শান্তি শিক্ষা ও শান্তির নেতৃত্ব বিষয়ক কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে এবং এক হাজারেরও বেশি তরুণকে এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাদের অনেকেই ব্যক্তি জীবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। কারো বিশ্বাস করে; একজন তরুণ যখন শান্তি শেখে, তখন একটি পরিবার বদলায়; আর হাজারো তরুণ শান্তির নেতৃত্বে এগিয়ে এলে বদলে যেতে পারে পুরো সমাজ। শান্তির চর্চা ব্যক্তি থেকে সমাজে, সমাজ থেকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার এই যাত্রাই পিস ইনিশিয়েটিভের মূল প্রেরণা।
মো. খালেদ সাইফুল্লাহ
ইনিশিয়েটর, পিস ইনিশিয়েটিভ
সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সেক্রেটারি, কারো (ঈঅজঙ)
চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব শেখা
প্রচলিত নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ সাধারণত তাত্ত্বিক আলোচনা ও কেস স্টাডির ওপর নির্ভরশীল। তবে চষধুবৎঙহব ঝরসঁষধঃরড়হ নেতৃত্ব বিকাশে আরো বাস্তবধর্মী ও অংশগ্রহণমূলক একটি পদ্ধতি উপস্থাপন করে। বাস্তব জীবনের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশে অংশগ্রহণকারীদের যুক্ত করে এই সিমুলেশন নেতৃত্ব শেখাকে একটি সক্রিয় ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষায় পরিণত করে। PlayerOne এ অংশগ্রহণকারীরা মেয়র, সংসদ সদস্য, সাংবাদিক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সময় তাদের চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করতে হয় এবং নিজেদের সিদ্ধান্তের ফলাফল সামলাতে হয়। এই প্রক্রিয়া অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর ব্যবস্থায় বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা ও প্রভাব বুঝতে সহায়তা করে।
সিমুলেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সিস্টেমস থিংকিং বা সমন্বিত চিন্তার ওপর জোর। অংশগ্রহণকারীরা উপলব্ধি করতে শেখেন যে বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো পরস্পর সংযুক্ত এবং কার্যকর নেতৃত্বের জন্য স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। প্রস্তুত সমাধান দেওয়ার পরিবর্তে, এই সিমুলেশন এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে যেখানে অংশগ্রহণকারীরা নতুন ধারণা পরীক্ষা করতে পারেন, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারেন এবং নিজেদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি আরো শানিত করতে পারেন। চষধুবৎঙহব ঝরসঁষধঃরড়হ নেতৃত্ব শিক্ষার একটি উদ্ভাবনী মডেল, যা শুধু দক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়, বরং জটিল বাস্তবতা বুঝতে ও তা সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম চিন্তাশীল নেতৃত্বও গড়ে তোলে।
সামিয়া তুলতানা রিদি
ইনচার্জ, গ্লোবাল গর্ভনেন্স ল্যাব (ঈঅজঙ)
শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
তরুণ নেতৃত্বে সুশাসনের নতুন দিগন্ত: ঈঅজঙ’র ঈগঊচ
বাংলাদেশের সুশাসন ও নাগরিক ক্ষমতায়নে কারো’র ঈগঊচ সুশাসন, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অধিকারের বাস্তব চর্চা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই কারো (ঈঅজঙ) এর অধীনে ঈড়সসঁহরঃু গবসনবৎং ঊসঢ়ড়বিৎসবহঃ চৎড়মৎধস (ঈগঊচ) এর যাত্রা শুরু হয়। এটি শুধু একটি গবেষণা কর্মসূচি নয়, বরং তরুণদের মাধ্যমে দেশজুড়ে একটি শক্তিশালী নাগরিক গবেষণা ও নেতৃত্বের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার এক বাস্তব উদ্যোগ। ঈগঊচ-এর মূল লক্ষ্য হলো তরুণদেরকে সুশাসনের প্রকৃত জ্ঞান, মাঠপর্যায়ের গবেষণা দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের বাস্তব ক্ষমতা দিয়ে গড়ে তোলা, যাতে তারা নিজ নির্বাচনী এলাকায় সক্রিয় নাগরিক নেতৃত্ব দিতে পারে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমরা তরুণদের শুধু তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে নয়, বরং সুশাসনের স্থানীয় চ্যাম্পিয়ন এবং ভবিষ্যৎ বিভাগীয় সমন্বয়কারী হিসেবে প্রস্তুত করছি। জানি, দেখি, পরিবর্তন আনি এই দর্শনকে সামনে রেখে ঈগঊচ তরুণদেরকে সরকারি কাঠামো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দেয়। কর্মশালা, মাঠকর্ম, সমস্যা বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন তৈরি এবং নেতৃত্ব বিকাশের মাধ্যমে প্রোগ্রামটি অংশগ্রহণকারীদেরকে শুধু সচেতন নাগরিক নয়, বরং সক্রিয় পরিবর্তনকারীতে রূপান্তরিত করে।
ইতোমধ্যে ৪৫০ জনেরও বেশি প্রশিক্ষিত অংশগ্রহণকারী, ১৬ জন ডিভিশনাল লিডার, ২১১টি সংসদীয় আসন এবং দেশের সকল ৮টি বিভাগ জুড়ে ঈগঊচ একটি শক্তিশালী গ্রাউন্ড নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। এই নেটওয়ার্ক কারোর ঋধরৎহবংং ওহফবী কে ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, বরং সত্যিকারের জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলছে। করো বিশ্বাস করে একজন দক্ষ ঈগঊচ কো-অর্ডিনেটর যখন তার এলাকায় কাজ করেন, তখন শুধু একটি ইউনিয়ন বা উপজেলা নয়, পুরো নির্বাচনী এলাকার নাগরিক কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হয়। আর যখন আটটি বিভাগেই এমন সমন্বয়কারী নেতৃত্ব দাঁড়াবে, তখন দেশজুড়ে সুশাসন ও জবাবদিহিতার এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
আমরা বিশ্বাস করি, দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সচেতন ও দক্ষ তরুণদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারলে সুশাসনের দাবি আর কেবল কাগজে-কলমে থাকবে না, বরং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হবে। ঈগঊচ এই নেটওয়ার্কের ভিত্তি তৈরি করছে।
সুমাইয়া আমিন বৃষ্টি
অপারেশনস এন্ড প্রোগ্রাম কোর্ডিনেটর (ঈঅজঙ)
শিক্ষার্থী, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি।
তরুণ নেতৃত্ব গঠনে ঠঊচ
ভলান্টিয়ারিং মানে অনেকেই মনে করেন যে, কিছু কাজ করলাম, সার্টিফিকেট পেলাম, তারপর সেটা ফেসবুক বা খরহশবফওহ এ সেটা দিয়ে একটা পোস্ট করলাম। কিন্তু করোর ঠঊচ প্রোগ্রাম আপনার সেই ধারণাটা পুরোপুরি পরিবর্তন করে দিবে।
ঠঊচ প্রোগ্রামে যোগদান করে একজন শুধু মাত্র কাজ করে না, সে বাস্তব একটা অফিসে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে এবং একই সঙ্গে তার নিজের ভিতরের জড়তাকে কাটিয়ে আত্ম-উন্নায়ন। যেমন, যখন একটা কন্টেন্ট বা স্পিচ রেডি করতে বলা হয় তখন সে সবার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করা ও ক্যামেরার সামনে কথা বলার ভীতিকে জয় করতে পারে। যখন কোনো দলগত কাজ করতে দেওয়া হয়, তখন ভিন্ন ভিন্ন মতামতকে কিভাবে একসঙ্গে করে একটা ভালো ফলাফল নিয়ে আসা যায় সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। আবার মেন্টর যখন কাজের মূল্যায়ন করে তখন সেখান থেকে কিভাবে আরো ভালো করা যায় সেটাও শিখতে পারে। এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আসল নেতৃত্ব তৈরি করে। বিগত চার বছরে ঠঊচ শুধু মাত্র তরুণদের কাজ করতে শেখায় নাই, তাদের নিজেদেরকে যাচাই করার জন্য একটা বাস্তব প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে, যা তাদেরকে বাস্তব জীবনে আরো বেশি অভিজ্ঞ ও সাহসী করে তুলেছে।
আমির হোসেন
মেন্টর, এডুকেশন এন্ড রিসার্চ (ঈঅজঙ)
শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
"









































