জুবায়েদ মোস্তফা, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
গোবিপ্রবির রজতজয়ন্তী সম্ভাবনা সংকট ও বাস্তবতা

“যেখানে জ্ঞান জন্ম নেয়, আর সবুজে স্বপ্ন গাঁথা হয়,
সেই ভূমিই গড়ে তোলে আগামীর আলোকবর্তিকা।”
দক্ষিণ বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোবরা ইউনিয়নের মধুমতির তীরে গড়ে উঠেছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (এঝঞট)। সবুজ শ্যামল পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সম্ভাবনা, স্বপ্ন ও নতুন পথচলার নাম। প্রায় ৫৫ একর জমির উপর গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়টি এক সময় দেশের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষার্থী বহুল ক্যাম্পাসে পরিণত হয়েছিল। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়, যার মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে এটি হয়ে ওঠে এক আস্থা ও গর্বের প্রতীক।
প্রকৃতির রঙে আঁকা এক সবুজ বিশ্ববিদ্যালয় গোবিপ্রবি:
ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সবুজে ঘেরা বিখ্যাত ক্যালিফোর্নিয়া রোড। গাছের পাতার ফাঁকে রোদ্দুরের আলতো ঝিলিক যেন বলে-
“এখানে জ্ঞান জন্ম নেয় সবুজের কোলে,
স্বপ্ন বুনে চলে প্রতিদিন, নিরবে, নীল আকাশের তলে।”
বনলতা সেন রোড, কৃত্রিম পাহাড়, আর লেক পাড়ের প্রশান্তি শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে বিশেষভাবে। মন খারাপের বিকেল কিংবা সাফল্যের উদযাপন, লেক পাড় যেন সব আবেগের আশ্রয়স্থল।
স্থাপত্যের ছোঁয়ায় আধুনিকতার ছাপ:
বহু শিক্ষার্থীর স্বপ্নে আঁকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে রয়েছে-
একাডেমিক ভবন,
প্রশাসনিক ভবন
তিনটি ছাত্র হল (স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ তিতুমীর হল)
দুটি ছাত্রী হল (অপরাজিতা হল, বনলতা সেন হল)
একুশে ফেব্রুয়ারি লাইব্রেরি, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও মন্দির, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও ল্যাংগুয়েজ ল্যাব,
দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ও ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট,
শিক্ষক-স্টাফদের জন্য ডরমিটরি ও কোয়ার্টার।
সফলতার মাঝেও কিছু বেদনাদায়ক বাস্তবতা:
হাটি হাটি পা পা করে এই বিশ্ববিদ্যালয় ২৬তম বর্ষে পা দিলেও এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও অসমাপ্ততা শিক্ষার্থীদের মনে হতাশা ডেকে আনে। যেমন:
একাডেমিক ভবনের সংকট : বর্তমানে বেশ কিছু বিভাগে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় ক্লাসের সময় নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। একাডেমিক ভবন-২ নির্মাণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
অডিটোরিয়াম: সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র: একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম না থাকায় সেমিনার, ওয়ার্কশপ, বিতর্ক কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন বাধাগ্রস্ত হয়। এটি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
নতুন হলের প্রয়োজনীয়তা : বর্তমান হলে শিক্ষার্থীদের আবাসন চাহিদা পূরণ হয় না। ফলে অনেককে বাইরে থাকতে হয়, যেখানে স্থানীয়দের সঙ্গে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। নতুন ছাত্র-ছাত্রী হল নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসনের সুযোগ পাবে।
সীমানা প্রাচীর নিরাপত্তার প্রশ্নে জরুরি : খোলা ক্যাম্পাস হওয়ায় প্রায়ই বাইরের হস্তক্ষেপ কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। পূর্ণাঙ্গ সীমানা প্রাচীর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও ভাবমূর্তি উভয়ের জন্য প্রয়োজনীয়।
ক্যাম্পাসের প্রধান ম্যুরাল: সাংস্কৃতিক ও ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি: বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মুখে একটি দৃষ্টিনন্দন ম্যুরাল স্থাপন করলে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বাড়বে এবং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠবে।
জিমনেসিয়াম: স্বাস্থ্য সচেতনতার বিকল্প নেই: শুধু পাঠ্যবই নয়, স্বাস্থ্যও শিক্ষার একটি বড় অংশ। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ মোকাবিলায় এবং সুস্থ দেহের জন্য জিমনেসিয়াম একটি যুগোপযোগী দাবি।
সমাবর্তনের অভাব, এক অসমাপ্ত অধ্যায়
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি, যা হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য এক অপূর্ণতা। ডিগ্রি পাওয়াই শেষ হয়ে যাওয়া নয়, সমাবর্তন মানে হল গর্বের এক আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত। যা স্বীকৃতি দেয় সাফল্যের, দেয় আত্মবিশ্বাস। সমাবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। এটি না থাকায় তাদের অর্জনের তাৎপর্য কমে যায়।
গবেষণা, শিক্ষক সংকট ও সেশনজট, ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ-
শিক্ষক সংকট এখনো এক ভয়াবহ বাস্তবতা।
কিছু বিভাগে অধ্যাপকই নেই, পাঠদানে সমস্যা তৈরি হয়।
গবেষণা কার্যক্রম প্রায় অনুপস্থিত।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ব্যাপার হল সেশনজট অনেক বিভাগের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘শুধু ক্লাসে ঢুকে বই মুখস্থ করলেই শিক্ষা নয়,
গবেষণার দীপ্তি, অনিশ্চয়তার বিপরীতে আলো খোঁজাও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ।’
গোবিপ্রবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা:
গোবিপ্রবি এখন আর নবীন নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে অনেক কিছু দেওয়ার সময় এসেছে। একাডেমিক ভবন, অডিটোরিয়াম, ম্যুরাল, জিমনেসিয়াম, নতুন হল এসব শুধু চাওয়া নয়, সময়ের অনিবার্য দাবি।
তাই আমরা চাই-
গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ুক।
বিভাগভিত্তিক অধ্যাপক নিয়োগ হোক।
সেশনজট নিরসনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠিত হোক।
সমাবর্তনের প্রস্তুতি শুরু হোক।
শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক জোরদারে টিএসসি স্থাপন হোক।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল দেয় না, সে গড়ে, সে জাগায়। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয় তার সম্ভাবনার দিগন্তে পৌঁছানো জরুরি। একটু সচেতন পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে এই প্রতিষ্ঠানকে দেশের এক শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পরিণত করতে।
"









































