শুভ কর্মকার, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
টাকা কম, আনন্দ বেশি : মাত্র ১০০ টাকার ট্যুর

বন্ধুবান্ধবদের ট্যুর সাধারণত হুটহাট সিদ্ধান্তেই হয়। কোনো বড় পরিকল্পনা না, বাজেট না হঠাৎ করেই ঠিক হয়ে যায় কোথাও ঘুরতে যাওয়া। সেই ধারাবাহিকতায় একদিন সন্ধ্যায় আমাদের ক্যাম্পাসের মেইন গেটে আড্ডা দিতে দিতে হঠাৎ সিদ্ধান্ত হলো রংপুরের আশপাশে ঘুরতে যাবো, তাও মাত্র ১০০ টাকার মধ্যে।
ট্রেন ছিল সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে। সবাইকে বলে দিলাম? আগে উঠবি, আর অবশ্যই ফোন দিয়ে বাকিদের জাগাবি। আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রথম দেখি সবাই টাইমমতো রেডি হয়ে মেইন গেটে হাজির। তারপর অটো আর একটু হাঁটা পথ পেরিয়ে স্টেশনে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে দেখি ৩ জন জুনিয়র দাঁড়িয়ে জানতে পারলাম, তারাও আমাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য এসেছে। আমরা সাধারণত ৫ জন একসঙ্গে যাই, কিন্তু এবার আমাদের অভিভাবকসুলভ বন্ধু শ্রীকান্ত নেই। তার বিয়ের কাজে ব্যস্ত। সে থাকলে মজা আর রাগারাগি দুটোই একটু বেশি হতো। স্টেশনে আরও ৩ জন যোগ দিয়ে আমরা ৭ জনের দলে পরিণত হলাম।
আমাদের গন্তব্য ছিল শ্যামপুর রংপুরের পরের স্টেশন। ট্রেনেই যাবো, কারণ পুরো ঘোরাঘুরির বাজেট মাত্র ১০০ টাকা। বেশি টাকার ট্যুর আমাদের কপালে কই! সকাল ৮টা ০৩ মিনিটে ট্রেন শ্যামপুরে থামলো।
সেখান থেকে শালবনের পথে হাঁটতে হাঁটতে সবার জীবনের গল্প, ভবিষ্যতের প্ল্যান, আর পরের ট্যুর কোথায় হবে এসব নিয়েই চলছিল আড্ডা। শালবনে ঢুকতেই শুরু হলো ছবি তোলার হিড়িক। তারপর ভাইরাল ভিডিও বানানোর জন্য নাচের প্র্যাকটিস, হাসাহাসি আর ঘোরাঘুরি।
শ্যামপুরের শালবনে যেতে যেতে অনেক মাটির বাড়ি দেখলাম। সবচেয়ে অবাক হলাম লাল মাটি দেখে। রংপুরে তো সাধারণত লাল মাটি দেখা যায় না, অথচ এত কাছেই লালচে মাটির বিস্তার! মাটির বাড়ি আমার এমনিতেই খুব পছন্দ, তাই দৃশ্যগুলো আলাদা ভালো লাগছিল।
শালবন দেখা শেষে অটো করে আবার স্টেশনে এলাম। এবার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের এক সময়ের সবচেয়ে বড় সুগার মিল, যা এখন বন্ধ। সেখানে গিয়ে অনেক কিছু অনুভব করলাম। সরকারি জিনিস কীভাবে নষ্ট হয়, আর মানুষ দিন গুনে কবে পুরোপুরি ধ্বংস হবে সব যেন চোখের সামনে। মিলের ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু ঢুকতে দিল না। কারণ সেদিন শুক্রবার। যদিও আমরা জানি, এটি প্রায় ৭ বছর ধরেই বন্ধ পড়ে আছে।
ভেতরে ঢুকতে না পেরে চারপাশে ঘুরে দেখলাম। বিশাল আবাসন বড় কর্মকর্তা, কর্মচারী আর শ্রমিকদের থাকার কোয়ার্টার। একসময় এখানে কত লোক কাজ করতো, এখন সব নিঃসঙ্গ, নিস্তব্ধ, জনশূন্য। শুধু গুটি কয়েক গার্ড পাহারা দিচ্ছে। যেখানে একসময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতো, এখন তা দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো পদক্ষেপ নেই, বলারও যেন কিছু নেই। সত্যিই মনে হচ্ছিল মরার উপর খাঁড়ার ঘা। আশীর্বাদ এখন অভিশাপে পরিণত। চাইলে এখানে অন্য কোনো শিল্প স্থাপন করা যেত, তাহলে এলাকার মানুষের উপকার হতো।
তবে আমরা তো ঘুরতে এসেছি। মন খারাপ করে তো ট্যুর শেষ করা যায় না। তাই এবার আমাদের গন্তব্য লালদীঘীর পাড়। প্রায় ২০-৩০ মিনিট রোদের মধ্যে হাঁটলাম। পথে কত গ্রুপ ছবি তুলেছি, তার হিসাব নেই। লালদীঘীর পরিবেশ এত সুন্দর যে মনে হচ্ছিল আজ এখানেই থেকে যাই। সবাই বলছিল প্রতি সপ্তাহে এখানে আসবো।
এদিকে প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। কেউ বিশ্রাম নিতে চায়, তপু বলছে চল উঠি, সজীব শুয়ে কাত হয়ে আছে, অভি বিরক্ত বৌদি ছাড়া নাকি তার ঘোরা জমে না! আর ৩ জন ছোট ভাই নিজেদের ছবি তুলতেই ব্যস্ত।
শেষমেশ ট্রেনের সময় হয়ে গেল। ট্রেন মিস করলে ১০০ টাকার ঘোরাঘুরি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম। স্টেশনে এসে ট্রেনের অপেক্ষা করতে করতে ক্ষুধা আরো বেড়ে গেল। তখন মনে পড়লো রমজান মাস, খাবার পাওয়াই কঠিন। যা পেলাম তাই খেয়ে নিলাম।
হঠাৎ ট্রেন এসে গেল। প্রথম বগিতে উঠতে যাবো, দেখি টিটি! আর দেরি না করে সবাই দৌড়ে অন্য বগিতে উঠে পড়লাম। সেই দৌড়ঝাঁপেই যেন আলাদা মজা। অবশেষে স্টেশন থেকে ক্যাম্পাসে ফেরা সফল হলো আমাদের ১০০ টাকার ঘোরাঘুরি।
টাকা ছিল কম, কিন্তু আনন্দ ছিল ভরপুর। আর এই ট্যুর প্রমাণ করে বন্ধুত্ব থাকলে ১০০ টাকাও যথেষ্ট একটা স্মরণীয় দিনের জন্য।
"









































