reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের ভাবনা

পুরুষ শাসিত আমাদের সমাজের একটি মারাত্মক ব্যাধি ‘নারী নির্যাতন’। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই আর দশজন মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরা কাজ করে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীনের পর থেকেই নারীদের জীবনমানে অকল্পনীয় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা তো কমেইনি বরং নিত্যনতুন কৌশল ও পন্থায় নারীর প্রতি পাশবিকতা এবং নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এমনকি নিজ ঘরেই নিগৃহীত হচ্ছেন তারা। সমাজ ও সভ্যতা যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই যেন এ প্রবণতা বেড়ে চলেছে। প্রতিদিনের পত্রিকার পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে নির্যাতিত, অবহেলিত, বিচারহীন হাজারো নারীর আর্তনাদের গল্প। নারী নির্যাতন বন্ধে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর ভাবনা ও মতামত তুলে ধরেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ

নারী নির্যাতন বন্ধে সুবিচার জরুরি

হাজারো দুঃখ-কষ্ট লুকিয়ে থাকা একটি শব্দ ‘নারী’। নারী মানে হাজারো স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়া এবং স্রোতের প্রতিকূলে গিয়ে লড়াই করে যাওয়া এক টুকরো আত্মবিশ্বাস। এটি শুধু একটি শব্দ নয়, বরং এটির হাজার অর্থ এবং এতে লক্ষ-কোটি অনুভূতি বিদ্যমান। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এই নারী শব্দটা বড়ই অবহেলিত। নিজের শখ, আহ্লাদ, ইচ্ছা বিসর্জন দেওয়া এই নারী বর্তমানে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে হাজারো প্রতিবাদ, হাজারো বিক্ষোভ হলেও তাও যেন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। নারী নির্যাতন বন্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা সেই আইনকে মোটেই তোয়াক্কা করে না। নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আমাদের নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রতিবাদ করতেই হবে এবং কোনোভাবেই এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। নারী নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি আরো বৃদ্ধি করতে হবে।

ইসরাত জাহান

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ

চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম।

 

জবাবদিহি বাড়াতে হবে

বর্তমানে এমন কোনো পর্যায় নেই যেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা এগিয়ে নেই। নারীরা মাঠ-ঘাট থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে পুরুষসম অবদান রাখছে। অথচ এই নারীই প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হয়ে পত্রিকার শিরোনামে পরিণত হচ্ছে। যদিও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশে আইনের কোনো ঘাটতি নেই, তারপরও নির্যাতন বাড়ছেই। আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও পদক্ষেপ নিলে নারী নির্যাতনের মাত্রা কমানো সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি বাড়াতে হবে। ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রণয়ন করা হলেও এখনো এর সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। আইন সংশ্লিষ্টরা কোনো গাফিলতি করলে শাস্তির বিধান আছে, হাইকোর্টের রায় আছে। কিন্তু কেউ শাস্তি পেয়েছে আজ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো নজির নেই। প্রতিদিন পত্রিকা ভরে শুধু নারী নির্যাতনের খবর আসে, এর শাস্তির খবর আসে না। জবাবদিহি হবে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের একমাত্র হাতিয়ার। তাই নারী নির্যাতন প্রতিরোধে জবাবদিহি বাড়াতে হবে।

লাইজু আক্তার

শিক্ষার্থী, প্রথম বর্ষ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ

নারায়ণগঞ্জ।

 

বন্ধ হোক নারী নির্যাতন

বাংলাদেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সম-অধিকার রয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক ক্ষেত্রে নারীরা তাদের প্রাপ্য সম্মান পায় না বরং প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রেও নারীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং যাতায়াতে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারী নির্যাতনের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে যৌতুক প্রথার প্রচলন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে অনেক নারী। তাই যৌতুকের মতো এমন একটি সামাজিক ব্যাধিকে বন্ধ করতে হবে। বাল্যবিয়ের কারণে মেয়েরা সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হয়। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ২০০০ সালে প্রণীত হয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। তবুও বেড়ে চলেছে নারী নির্যাতন। আইন থাকা সত্ত্বেও নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে প্রণীত আইনগুলোর বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা। পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ব্যক্তি সচেতনতা থেকে শুরু করে এই বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ সমাবেশে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং ব্যক্তি, সমাজ ও সরকারেরই মূল দায়িত্বটা পালন করতে হবে।

কামরুন্নাহার আঁখি

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ

নরসিংদী সরকারি কলেজ

নরসিংদী।

 

কর্মমুখী শিক্ষা ও সচেতনতা প্রয়োজন

সমাজে নারী পুরুষ সবাই দুজনেই সমাজের অগ্রগতি সাধন করতে পারে। সমাজের উন্নতি সাধন করতে শুধু পুরুষরা কাজ করে অগ্রগতি সাধন করবে এমন চিন্তাধারা ঠিক নয়। নারী ও পুরুষ একজনকে আরেকজনের সহযোগী ভাবা উচিত, প্রতিযোগী নয়। নারীরা আজ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করছে, এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তবু এখনো আমাদের সমাজে নারীরা অবহেলিত ও নির্যাতিত। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে নারীদের সচেতন করে তুলতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রথমত প্রয়োজন নারীদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। যদিও নারীরা এখন অনেক এগিয়ে আছে। তবে শুধু সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষা নয়, তা হতে হবে কর্মমুখী। তাহলেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে তারা। বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, ‘স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটি বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপেন সেলাই করিবার জন্য।’ রান্নাঘরের চালচুলো আর বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য প্রস্থের এই ছোট্ট পরিসরে নিজেদের বন্দি রাখলে চলবে না, তাদের কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। নিজের দায়িত্ব নিজেকে বহন করার যোগ্য করে তোলার সুযোগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আমাদের নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রতিবাদ করতেই হবে এবং কোনোভাবেই এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। নারী নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি আরো বৃদ্ধি করতে হবে।

মোছা. জেলি খাতুন

শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, রসুলপুর, কুড়িগ্রাম।

 

আইনের সঠিক প্রয়োগ জরুরি

বর্তমান সময়ে আশঙ্কাজনক হারে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। পথে-ঘাটে, বাসে-ট্রেনে এমনকি বাসা, স্কুল- কলেজ, মাদ্রাসা বা কর্মস্থলে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষতায় এসে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের নারীরা প্রতিদিনই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এটা বড়ই দুঃখজনক। বিচারহীন বা ন্যায়বিচারের অভাব একটি সমাজ ধীরে ধীরে অপরাধ প্রবণ হয়ে ওঠে। এ অপরাধ প্রবণতা দূর করতে হলে সর্বাগ্রে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং সেই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও পদক্ষেপ নিলে নারী নির্যাতনের মাত্রা কমানো সম্ভব হবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করতে হবে। দ্রুততম সময়ে প্রতিটি নারী নির্যাতনের ন্যায্য বিচার করতে হবে এবং বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে মামলা পরিচালনার প্রতি জোর দিতে হবে। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, জোরালো অবস্থান নিতে হবে এবং সমস্বরে আওয়াজ তুলতে হবে। যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ নারীর জন্য লজ্জার বিষয় নয় বরং এ লজ্জা নির্যাতনকারী ও ধর্ষণকারীর। প্রতিটি দিন হোক নারী নির্যাতনমুক্ত।

ফারদিন কবির মাহিয়া

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ,

ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ

গাজীপুর।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close