রেজাউল করিম খোকন

  ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

বাঙালি উৎসব ও আনন্দপ্রিয় জাতি। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা উপলক্ষ্যে তারা আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে। সেসবের মধ্যে ব্যতিক্রমী হয়ে আবির্ভূত হয় বাংলা নববর্ষ যার স্বাদ, গন্ধ ও আবেদন অন্যান্য উৎসব হতে একেবারেই আলাদা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে সব মানুষ, সব বাঙালি সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে সমগ্র জাতি একই হৃদয়াবেগে একটি মোহনায় মিলিত হয়ে পালন করে এই সর্বজনীন উৎসব। চিরায়ত বাঙালিত্বের অহংকার আর সংস্কৃতির উদার আহ্বানে জাগরুক হয়ে নাচে-গানে, গল্পে-আড্ডায়, আহারে-বিহারে চলে নতুন বছরকে বরণ করার পালা। বাংলা নববর্ষ তাই বাঙালিদের জীবনে সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এর মাধ্যমে জাতি তার স্বকীয়তা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তি সঞ্চয় করে; সচেষ্ট হয় আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে।

নববর্ষই বাঙালি জাতিকে ইস্পাত-কঠিন ঐক্যে আবদ্ধ করেছিল, শক্তি ও সাহসের সঞ্চার করে স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল। কবিগুরুর ভাষায়- ‘নব আনন্দে জাগো আজি নব রবির কিরণে শুভসুন্দর প্রীতি উজ্জ্বল নির্মল জীবনে। অমৃত পুষ্প গন্ধ বহ শান্তি পবনে দেহে মনে নির্ভেজাল আনন্দ উপভোগে।’ নববর্ষ বিদায়ী বছরের গ্লানি মুছে দিয়ে বাঙালি জীবনে ওড়ায় নতুনের কেতন, চেতনায় বাজায় মহামিলনের সুর। সব ভেদাভেদ ভুলে সব বাঙালিকে দাঁড় করায় এক সম্প্রীতির মোহনায়। নববর্ষের আগমনী ধ্বনি শুনলেই সমগ্রজাতি নতুনের আহ্বানে জেগে ওঠে। গ্রামের জীর্ণ-কুটির হতে বিলাসবহুল ভবন কিংবা দূর প্রবাসের মেগাসিটি- সর্বত্রই প্রবাহিত হয় আনন্দের ফল্গুধারা। আবহমান বাংলার চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনার মূলে রয়েছে এক অসাধারণ অনুষঙ্গ; সেটি হল বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখ। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় বাংলা বর্ষবিদায় ও বরণের অনুষ্ঠানমালা তাই আমাদের সেই ঐতিহাসিক চেতনাকে প্রোজ্জ্বল করে।

স্বদেশ মানস রচনায় বাঙালি সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ঐতিহ্য সর্বোপরী ইতিহাসের আলোকে রক্ষণশীল ও পশ্চাৎপদ চিন্তা-চেতনাকে পরিহার করে আধুনিক ও প্রাগ্রসর অভিধায় জাতিসত্ত্বাকে যথাযথ প্রতিভাত করার সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি বাংলা নববর্ষকে দান করেছে অনবদ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা। তবে বাঙালির নববর্ষ সব বাঙালির কাছে একভাবে আসেনি। কারো কাছে এসেছে খরা হয়ে, কারো কাছে খাজনা দেওয়ার সময় হিসেবে, কারো কাছে বকেয়া আদায়ের হালখাতা হিসেবে, কারো কাছে মহাজনের সুদরূপে আবার কারো কাছে এসেছে উৎসব হিসেবে।

তবে বাংলা নববর্ষ যেভাবেই আসুক না কেন এখন তা বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। তাই পহেলা বৈশাখ এলেই সব বাঙালির প্রাণ বাংলা নববর্ষ বরণের আনন্দে আপনা আপনিই নেচে ওঠে। পহেলা বৈশাখ তাই পালিত হয় ব্যক্তিগত, ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, শ্রেণীগত অবস্থানের উর্ধ্বে উঠে ‘মানুষ মানুষের জন্য- এই বিশ্বাসকে সমাজ জীবনের সর্বত্রছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। ওয়াহিদুল হক, সন্জীদা খাতুন প্রমুখের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দালালদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালনের সময় থেকে ছায়ানট প্রবর্তনায় রমনার বটমূলে যে পহেলা বৈশাখ শুরু হলো-তা আজ গ্রাম-বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। তবে সামাজিক উৎসব হিসেবে নববর্ষ পালন শুরু হয় ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। পঞ্চাশের দশকে লেখক-শিল্পী-মজলিস ও পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ নববর্ষ উপলক্ষ্যে ঘরোয়াভাবে আবৃত্তি, সঙ্গীতানুষ্ঠান ও সাহিত্যসভার আয়োজন করত। সন্জীদা খাতুনসহ অন্যান্যদের উদ্যোগে ছায়ানটের আয়োজনে কবিগুরুর ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে বাংলা বছরের প্রথম দিন সকালে নববর্ষের আবাহন শুরু হয় রমনাঅশ্বত্থতলায় ১৯৬৫ সালে। পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী চেতনার পালে যতই হাওয়া লেগেছে ততই উৎসবমূখর হয়েছে নববর্ষের আয়োজন।

পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধকরণসহ সাংস্কৃতিক নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করার পরও নববর্ষে লাগে নিত্যনতুন উদ্দীপনা। দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার পহেলা বৈশাখকে জাতীয় পার্বণ হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর ছায়ানট ছাড়াও রাজধানীতে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলা একাডেমি, চারুকলা ইনস্টিটিউট, শিল্পকলা একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, নজরুল ইনন্সিটিউট, জাতীয় জাদুঘর, বুলবুল ললিতকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন বাংলা নববর্ষকে মহাউৎসবে পরিণত করেছে। বর্তমানে পল্লীর নিভৃত কুটির হতে শুরু করে গ্রামগঞ্জ, জেলা শহর, বিভাগীয় শহর ও রাজধানী শহরের সর্বত্র উছলে পড়ে বাংলা নববর্ষ পালনের আনন্দ। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য হলো বাংলা বর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। আর বাঙালিদের কাছে বাংলা নববর্ষ বরণ হলো একটি প্রাণের উৎসব। বাংলা নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো বৈশাখী শোভাযাত্রা। ইউনেস্কো আমাদের পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রাকে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক মুল্যবেধের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো বৈশাখী শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি প্রদান করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করে নববর্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সাংস্কৃতিক সৌধের ভিত আরো সুদৃঢ় করুক, নববর্ষের উদার আলোয় জাতির ভাগ্যাকাশের সব অন্ধকার দূরীভূত হোক, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গীবাদী অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটুক, একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক, এটাই হোক বাঙালির প্রত্যয়।

পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করা হয়েছে এ বছর। পয়লা বৈশাখ উদযাপনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের নামকরণ বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে শোভাযাত্রা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পয়লা বৈশাখ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ, যার শিকড় প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজে নিহিত। কৃষিকাজ, ঋতুচক্র ও নতুন বছরের সূচনাকে কেন্দ্র করে এ উৎসবের বিকাশ ঘটেছে। গ্রামীণ সমাজে বৈশাখকে ঘিরে মেলা, গান, নৃত্য ও নানা লোকজ আয়োজনের মাধ্যমে এ উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। পয়লা বৈশাখ মূলত আনন্দের প্রতীক। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে অতীতের গ্লানি ভুলে ভবিষ্যতের মঙ্গল কামনা করাই এ উৎসবের মূল দর্শন। তবে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ও ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বাদ্যযন্ত্র ও লোকজ উপস্থাপনাকে স্থান দেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে বিভ্রান্তি ও মতবিরোধ দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে। ইউনেস্কো যে স্বীকৃতি ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা করে অনেকে বলেছিল সেটা হয়তো প্রত্যাহার করা হতে পারে। আমাদের দেশে এখন থেকে বৈশাখী শোভাযাত্রা হবে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি নিয়ে কোনো আশঙ্কা নেই। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীর রমনা বটমূলসহ বিভিন্ন স্থানে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে। বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য বজায় রেখে সবাইকে দায়িত্বশীলভাবে নববর্ষ উদযাপন করতে হবে। গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত থাকলেও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।

প্রকৃতির নিয়মে দেখতে দেখতে শেষ হয় বাংলা সন। বসন্তের শেষে গ্রীষ্মের ছোঁয়া লেগেছে প্রকৃতিতে। রোদের তাপদাহ বাড়ছে দিন দিন। আকাশে মেঘ জমছে। হঠাৎ বৃষ্টি ঝড় শুরু হয়ে গেছে। প্রকৃতি তার আপন বৈশাখীরূপে সেজে উঠছে। সেই ছোঁয়া লেগেছে শহর, গ্রাম আর শহরতলীতে। সবাই নিজ নিজ ভাবনায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কিভাবে বরণ করবে পয়লা বৈশাখকে। কৃষি কাজের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তনের হাত ধরে পয়লা বৈশাখের যাত্রা শুরু। বাংলা নববর্ষের আগমন আর চৈত্রের বিদায়ে বৈশাখের নবযাত্রা। পয়লা বৈশাখ মানে ঐহিহ্যের আবাহন। বাঙালিয়ানা ধরে রেখে চিরচেনা আনন্দে বববর্ষ বরণ। প্রাণের সুরে আরো একবার মেতে ওঠা বাঙালি উৎসবে। কালের আবর্তে হারিয়ে গেল আরো একটি বছর। ১৪৩২ বিদায় নিচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। নতুন বাংলা বছর ১৪৩৩ কে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সবাই। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে চারদিকে চলছে ব্যাপক তোড়জোর। ব্যাপক আয়োজনে বাঙালি নববর্ষের বর্নাঢ্য উচ্ছাসময় উৎসবের জন্য প্রস্তত হচ্ছে। বাংলা নববর্ষের আগে এখন সবখানেই সাজ সাজ আয়োজন। নববর্ষকে বরণ করে নিতে সবাই নিজেকে সাজিয়ে নেবেন সাদা-লাল রঙে/লাল-সাদা রঙের শাড়ি, হাতভরা কাঁচের চুড়ি, চোখে কাজল আর খোপায় গুজে দেওয়া ফুল-এই হলো বাঙালি মেয়েদের নববর্ষের সাজ। মেয়েদের পরণে লাল-সাদা শাড়ি, খোঁপায় বেলিফুলের মালা। রং বেরঙের পুতুল, মাটির খেলনা, মুখোশ, বাঁশি আর সাস বাতাসার ছড়াছড়ি। কোথাও নাগরদোলা, তারই পাশে হয়তো সার্কাস, লাঠি খেলা। চিরচেনা এ দৃশ্য আমাদের বৈশাখী উৎসবের। প্রতিবারের মতো এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রায় নতুন বছরকে বরণ করতে প্রস্তুত বাঙ্গালির উচাটন মন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে যেমন চলছে বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি তেমনি বিভিন্ন এলাকা প্রস্তুত হচ্ছে বৈশাখী মেলার জন্য। এখন রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোতে বৈশাখী মেলার ধুম পড়ে যায় নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে। বরাবরের মতোই এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাজুড়ে চলবে নববর্ষের উৎসব। চারুকলা থেকেই সকাল সকাল বের হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা নতুন বছর প্রত্যেক বাঙালির মনে অনাবিল আনন্দ আর সুখের বার্তা বয়ে আনুক, এমন প্রত্যাশা আর দেশের মঙ্গল কামনায় এ শোভাযাত্রার আয়োজন।

খুব ভোর থেকে রমনার বটমুলে চলবে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। পয়লা বৈশাখে জরাজীর্ণ, পুরাতনকে ছেড়ে নতুনের আহ্বানে ভেসে যাবে সবাই। ব্যর্থতা, না পাওয়ার গ্লানি, দুঃখ শোক, বঞ্চনার ক্ষোভ দুঃখ সবই ভুলে আবার নতুন করে জীবনের পথ চলার প্রত্যয় নিয়ে শক্তভাবে দাঁড়াবে নারী পুরুষ শিশু কিশোর তরুণ বয়স্ক সবাই। বৈশাখের রঙে নতুন চেতনায় সাজবে সবাই। বাঙালি যেন আকুল হয়ে প্রতীক্ষা করে বৈশাখী উৎসবের। কেননা আবহমানকাল থেকে বাঙালির চিরন্তন সর্বজনীন পার্বণ বাংলা নববর্ষ। বাঙালি আর বাংলা নববর্ষ এক বিকল্পহীন অভিযাত্রা। এই সময়ে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আনন্দে উদ্বেল হয় নববর্ষের আহ্বানে। মঙ্গল শোভাযাত্রা, হালখাতা, কারুশিল্প, লোক সংস্কৃতির বর্ণচ্ছটা, নতুন রঙিন পোশাক, হলুদ ফুলের সাজসজ্জা এবং ভোরের আলোয় নববর্ষের সুর্যোদয় সবই উদযাপন করার আকাঙ্ক্ষায় থাকে প্রতিটি মানুষ। এই সময়ে আমাদের ফ্যাশনভুবন আন্দোলিত হয় নতুন আনন্দে। পোশাকের আয়োজনে আসে নতুন সংযোজন। ডিজাইনে আসে নতুনত্ব। বৈশাখ মানেই লাল-সাদার চিরায়ত রূপ। আগেও নববর্ষের দিন নতুন শাড়ি পরার চল ছিল। উৎসবের নতুন পোশাক হিসেবে সবাই সবাই সাধারণত লাল পাড়ের সাদা শাড়ি বেছে নিত। এর পেছনেও কারণ ছিল পয়লা বৈশাখ ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সর্বজনীন একটি উৎসব। এই দিনে সবাই নতুন প্রাণের উচ্ছাসে ভেসে যেতে যেতে অনুভব করে বাঙালিত্বের অনাবিল বিচিত্র স্বাদ।

বাঙালি হয়ে জন্ম নিয়ে বাংলায় কথা বলা, বাংলায় বেড়ে ওঠার কি যে আনন্দ কি যে মজা তা সবাই আমরা অনুভব করি। দেশের মাটি, দেশের সংস্কৃতি যেন আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। সংস্কৃতি মানেই সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে আর মহৎভাবে বাঁচা। আর প্রতিনিয়ত মরতে মরতে বেঁচে থাকাটার নামই অপসংস্কৃতি। অপসংস্কৃতিতে বাংলা ও বাঙালির প্রতিটি বৈশাখেরই মৃত্যু হচ্ছে। এ মৃত্যু দৈহিক নয়। আতিœক ও মানসিক। অসুন্দরের উপসনা করে, অকল্যালের হাত ধরে বেঁচে থাকাটাই অপসংস্কৃতি। এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে চলছে অপসংস্কৃতির প্রচণ্ড দাপট লোভ লালসা, ষড়যন্ত্র, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, অপরাজনীতি আমাদের চিরন্তন বাঙালিয়ানাকে ম্লান করে দিচ্ছে। আমাদের জীবনাচরণ, খাদ্যাভ্যাস, বিনোদন, আবেগ উচ্ছাস সব কিছুতেই এখন বিদেশী সংস্কৃতির ছাপ সুষ্পষ্ট। বৈশাখ এলেই আমরা সবাই একদিনের জন্য যথার্থ বাঙালি হতে নানা কসরত করি। যা অনেক সময় হাস্যকর প্রহসন মনে হয়। শুধুমাত্র লোক দেখানো পান্তা ইলিশ উৎসবের আয়োজন রমনার বটমূলে ঘুরে বেড়ানোর কোনো তাৎপর্য থাকে না তখন। শুধুমাত্র একটি দিনের জন্য বাঙালি সাজার প্রহসন না করে সারা বছরের জন্য বাঙালি হওয়ার শপথ নিতে হবে সবাইকে। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি, বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে হবে আমরণ। সারা বছর জুড়েই আমরা বাঙালি থাকতে চাই। পোশাক আশাকে, চিন্তা চেতনায় মননশীলতায় বাঙালি সংস্কৃতি ও জীবনবোধকে গুরুত্ব দিতে সবাইকে বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। আসুন, এবারের পহেলা বৈশাখে নববর্ষের আনন্দ উৎসবে হৃদয়ের গভীর থেকে আত্নোপলদ্ধির চেষ্টা করি যে আমরা সবাই প্রত্যেকে খাঁটি বাঙালি। আমাদের বৈশাখী উৎসবে বিনোদনে আর উদযাপনে স্বদেশীয় বিশ্বাস, প্রথা ও চেতনাকে যুক্ত করতে যত্নবান হই। যারা অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসিয়ে স্বদেশীয় আর স্বজাতীয়, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে তৎপর তাদের প্রতিরোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এখনই। বাঙালি জীবনের অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন একটি উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ, বর্ষবরণের দিন, শুভ নববর্ষ।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

ধহধহহড়৮৬নড়ষষু@মসধরষ.পড়স

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়