আবু আফজাল সালেহ
বাংলা-নববর্ষ : নিজস্ব সংস্কৃতিতে বাঙালির স্বকীয় উৎসব

কৃষি ও রাজনৈতিক ভাবনা থেকেই বাংলা নববর্ষের প্রচলন। প্রকৃতির সঙ্গে খাপ-খাওয়াতে ও কৃষি-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সুশৃঙ্খলতা আনয়নের জন্য দিনপঞ্জি, সন ও তারিখের প্রণয়ন করা হয়। নববর্ষকেন্দ্রিক বৈশাখী মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা। এসময় মৈত্রী-সম্প্রীতির এক উদার মিলনক্ষেত্র তৈরি হয়। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই আসে মেলায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিকিকিনির আশা আর বিনোদনের টান। ঢাকা ও কলকাতার পাশাপাশি প্রবাস ও শহর-গ্রামে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীসহ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা উৎসবে মেতে ওঠেন, যা অখণ্ড বাঙালির প্রেরণা ও শক্তির উৎস।
‘বাংলা নববর্ষ’ বাঙালির এক অনন্য বৈশিষ্ট্যময় উৎসব। ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ। কেননা, পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে স¤পর্কিত, কিন্ত বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। চৈত্রমাসের শেষ দিন হচ্ছে জমিদারের খাজনা আদায়ের শেষ দিন। মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন, পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। দিনে দিনে পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে এক সর্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীরা স্ব স্ব প্রধান ধর্মীয় উৎসবে ভাতা পেয়ে থাকেন। সমস্ত বাংলাদেশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বর্তমান সরকার নববর্ষ উৎসব ভাতা চালু করেছে। এতে করে এ বাংলার সমস্ত বাঙালি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এদিন উৎসবমুখর হয়ে উঠেন। ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখ। এমন অসাম্প্রদায়িক উৎসব সত্যিই পৃথিবীতে বিরল। কার্নিভালে বা খ্রিস্টমাসের শুরুতে শহরাঞ্চল বর্ণিল হয়, আলোকমালায় হয়ে উঠে। ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন উদ্দ্যোমে শুরুর আয়োজন থাকে। বাঙালিরা ‘হালখাতা’ নামে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন করে হিসাব শুরু করে থাকেন। খ্রিস্টমাস উপলক্ষে দোকানে বা বিভিন্ন ব্যবসার ক্রয়-বিক্রয়ে রিবেট বা ছাড় দেওয়ার রেওয়াজ আছে। বাংলা নববর্ষেও কলকাতা বা বাংলাদেশে ছাড় বা বাট্টা দেওয়ার সংস্কৃতি রয়েছে। কলকাতাতে ‘চৈত্র সেল’ নামে পরিচিত। তবে বাঙালির এই উৎসব অসাধারণ বৈশিষ্ট্যময়। বাংলা নববর্ষের এ ঐতিহ্য মাটি ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত; এখানে কোনো জাতিভেদ ও ধর্মভেদ নেই। ঢাকা ও কলকাতার পাশাপাশি প্রবাসে ও শহর-গ্রামে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীসহ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা উৎসবে মেতে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথের গানটি হয়ে ওঠে প্রাণ, বাঙালি গেয়ে ওঠে :
‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক পুরাতন স্মৃতি,
যাক ভুলে যাওয়া গীতি, অশ্রুবা®প সুদূরে মিলাক।
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা...’
বাংলা নববর্ষ ও বৈশাখ ঘিরে বাঙালি কবি ও সাহিত্যিকরা সাহিত্য রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে হালের কবি-সাহিত্যিকরাও বৈশাখ নিয়ে কবিতা-সাহিত্য রচনা করছেন। ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় নজরুল বলেছেন ধ্বংস আর যুদ্ধ থেকেই নতুনের সৃষ্টি হয়! তেমনই বাংলা নববর্ষের কালবৈশাখী ঝড় বা রুদ্র রূপ থেকেই অনুপ্রেরণা পায় বাঙালি। সাড়ে তিনশ বছর পূর্বে আবুল ফজলের ঐতিহাসিক ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে বাংলা নববর্ষের উৎসবকে এদেশের জনগণের ‘নওরোজ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশমুক্ত হয়ে(দেশবিভাগের পর) শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বিরূপ অবস্থা সৃষ্টি হয়। এ অংশের(বর্তমানে বাংলাদেশ) বাঙালিরা এটিও মোকাবিলা করে ঐক্যবদ্ধতার সঙ্গে। বাঙালির আদি সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনকারী এই অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আমাদের বিশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে। এ ভূখণ্ডের বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছে এ সাংস্কৃতিক-উৎসব ও চেতনা। ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির সশস্ত্র-মুক্তিসংগ্রামসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামকে বেগবান করে। আমাদের অস্তিত্ব ‘স্বাধীনতা অর্জন’। আর নয়মাসের যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। এতে রক্ত ও ত্যাগ-তিতীক্ষা বিসর্জন দিতে হয়েছে। স্বাধীনতার প্রথম মাসেই এসেছিল পয়লা বৈশাখ-বাংলা নববর্ষ।
মুঘল সম্রাট আকবর(১৫৫৬-১৬০৫) বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। বৈশাখের সংস্কৃতি আমাদের জীবন-সাহিত্য ও বাঙালি জীবনে জড়িয়ে পড়ে ওতপ্রোতভাবে। নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক অনন্য বৈশিষ্ট্য মিলে নববর্ষ উৎসব এখন বাঙালির এক প্রাণের উৎসব- প্রাণবন্ত এক মিলনমেলা। নববর্ষ আদিম মানবগোষ্ঠীর কাছে ছিল সিজন্যাল ফেস্টিভ্যাল। নববর্ষ হিসেবে ‘পয়লা বৈশাখ’ সভ্য মানুষের ‘এগ্রিকালচারাল ফেস্টিভ্যাল’। সম্রাট আকবর সিংহাসন আরোহনের সময়(৯৬৩ হিজরি) ‘ফসলী সন’ নামে যে সন প্রবর্তন করেন যা কালক্রমে ‘বাংলা সন’ নামে পরিচিত লাভ করে। তখন হিজরি সনের ভিত্তিতে এ দেশে বছর গণনা হতো। হিজরি বছর সৌর বছর থেকে ১১ দিন ছোট হওয়ায় কৃষির হিসাব-নিকাশ এলোমেলো হয়ে যেত। এতে কৃষকদের ‘ফসলি সন’ গণনায় সমস্যা তৈরি হয়। ফলে কৃষকের কাছ থেকে জমিদারের খাজনা আদায় করতেও সমস্যা দেখা দেয়। জমিদার ও কৃষকদের সুবিধার্থে ও এই সমস্যা দূর করতে মূলত বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। বাংলা নববর্ষ এ দেশের একটা প্রাচীনতম ঐতিহ্য। পয়লা বৈশাখের উৎসবের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ-আসাম কৃষিপ্রধান অঞ্চল। তাই, বাংলা নববর্ষের উৎসবের আমেজটা কৃষকের একটু বেশিই থাকে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্যোগে পয়লা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন শুরু হয়। বৈশাখী সাজে নানান বাহারি মুখোশ, শোলার পাখি, টেপা পুতুল হাতে হাতে নিয়ে ঢাক-ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে হাজারো মানুষ অংশ নেন মঙ্গল শোভাযাত্রায়। ১৯৯১ সালে চারুকলার শোভাযাত্রা জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা লাভ করে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে’ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে এ সার্বজনীন শোভাযাত্রা। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে সব পেশার, সব শ্রেণির মানুষ শামিল হন মঙ্গল শোভাযাত্রায়। পয়লা বৈশাখ উদযাপনে অংশ নিতে আসা নারীদের মাথায় শোভা পায় ফুল, মুখে মুখে আলপনা, তরুণদের হাতে পতাকাসহ বিভিন্ন আয়োজন আমাদের কষ্ট-দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। পয়লা বৈশাখের উৎসব শুরুর দিকে ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। গ্রামীণ-মেলা, লোকজ খেলাধুলা ও নৃত্য-সংগীত ছিল প্রধান আকর্ষণ। দিনে-দিনে তা শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। কৃষিক্ষেত্রেও বৈশাখ মাসের গুরুত্ব অনেক। বৃক্ষের ক্ষেত্রেও নব উদ্যোমে নতুন জীবন গুরু হয়- নতুন পাতা গজিয়ে। একটি খনার বচন বলতেই পারি- ‘মাঘে মুখী, ফালগুনে চুখি, চৈতে লতা, বৈশাখে পাতা’।
অসাম্প্রদায়িক উৎসবের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ‘বাংলা নববষর্’। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি বাংলাভাষী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের জনগোষ্ঠীর একমাত্র সার্বজনীন উৎসব ‘বাংলা নববর্ষ’। বাঙালির এই উৎসব অসাধারণ বৈশিষ্ট্যময়। বাংলা নববর্ষের এ ঐতিহ্য মাটি ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। দিনে দিনে পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে এক সর্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সম্প্রদায়নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব ‘পয়লা বৈশাখ’ ঘিরেই। বৈশাখকেন্দ্রিক উৎসবকে ঘিরে বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ অপরাজেয় শক্তি হয়ে উঠেছে। বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণার নাম বা দিশারি হয়ে উঠেছে পয়লা বৈশাখ ও উৎসব ঘিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা।
"




































