প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক
ভারী বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, আতঙ্কে উপকূলবাসী
মৎস্য ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় পাহাড়ধস, বন্যা, বেড়িবাঁধে ভাঙন ও পাহাড়ি ঢলে প্রাণহানির পাশাপাশি বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, সড়ক ও অবকাঠামো। প্রশাসন ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে কাজ করছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) : টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ি ঢল ও বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পুকুরিয়া, সাধনপুর, খানখানাবাদ, বাহারছড়া, ছনুয়া, চাম্বল, গণ্ডামারা, কাথরিয়া, সরল ও শেখেরখীল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। একইসঙ্গে খানখানাবাদ ইউনিয়নের প্রেমাশিয়া রোসাঙ্গীপাড়া এলাকায় ভাঙন সৃষ্টি হয়ে উপকূলীয় এলাকার একমাত্র বেড়িবাঁধটি আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। গত ১-২ দিনের টানা বর্ষণে এই ভাঙনের সৃষ্টি হয়ে ক্রমান্বয়ে ভাঙনের আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেকোনো সময় বাঁধটি ভেঙে এলাকাটি তলিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে স্থানীয় অন্তত ২০ হাজার মানুষ বাঁধভাঙন আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। বাঁধটি ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করলে হাজার হাজার মানুষের ঘরবাড়ির পাশাপাশি কৃষিজমি, মৎস্য প্রজেক্ট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি হবে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাঁশখালী উপকূলীয় বেড়িবাঁধ সংস্কার ও সমুদ্রতীর প্রতিরক্ষার মেগা প্রকল্পের একটি কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে, যার ব্যয় সাড়ে ৪০০ কোটিরও বেশি টাকা। এর আগে বিগত সরকারের আমলে ২৯৩ কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে এই বেড়িবাঁধে। উক্ত ভাঙনস্থলে ২০২৬ সালের ২৬ জুন ৩৫টি জিও-টিউব স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ ৮-১০ দিনের মাথায় টিউবগুলো কীভাবে পানিতে তলিয়ে গেল, তা রহস্যজনক বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। অথচ সরকার বারবার হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকার জনগণের দুঃখের অবসান হচ্ছে না। নিম্নমানের কাজ ও দুর্নীতির কারণে বেড়িবাঁধ টেকসই হচ্ছে না বলেও তারা অভিযোগ করেন।
অপরদিকে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের আউশ ধানের বীজতলা, মৌসুমি সবজিক্ষেত ও বিভিন্ন ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদী ও খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বসতঘর, সড়ক, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হুমকির মুখে পড়েছে। যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ১ হাজার ৪২০ জন স্বেচ্ছাসেবক উপকূলীয় এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকরাও পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢল থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে উপজেলার প্রায় সব এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে ছড়া ও খালের বাঁধ ভেঙে মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বেড়িবাঁধ ভাঙনের ব্যাপারে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল জানান, ২০২৫ সালে খানখানাবাদের প্রেমাশিয়া এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। পরবর্তীতে ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে সেটি ঠেকাতে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ৩১টি জিও-টিউব দিয়ে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু ৮-১০ দিনের মাথায় অধিকাংশ জিও-টিউব সাগরের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা রহস্যজনক। উক্ত স্থানে জিও-ব্যাগ ডাম্পিং কাজ চলমান আছে। তবুও উপকূলবাসীর জীবনমান রক্ষায় ও বাঁধ ব্রিচ হওয়া ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে আগামীকাল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টে জিও-টিউব স্থাপন করা হবে। তাছাড়া যেকোনো স্থানে বাঁধে ভাঙন সৃষ্টি হলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত জিও-ব্যাগ ও জিও-টিউব মজুদ আছে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন বলেন, খানখানাবাদে বেড়িবাঁধের ভাঙনরোধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে উপজেলার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা যাবে। বিভিন্ন স্থানে পানিবন্দি থাকা মানুষকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরে রাখা হয়েছে এবং তাদের সহায়তার জন্য জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইদ আহমেদ বলেন, আমরা গত মাসে জিও-টিউব দিয়ে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়ন করেছিলাম। ৮-১০ দিনের মাথায় কে বা কারা জিও-টিউবগুলো কেটে নিয়ে গেছে। না হলে এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এভাবে জিও-টিউবগুলো সাগরের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কথা নয়। উক্ত এলাকায় জিও-ব্যাগ ডাম্পিং কাজ চলমান আছে। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে উপকূলবাসীর জীবনমান রক্ষায় ও বাঁধ ব্রিচ হওয়া ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত পয়েন্টে জিও-টিউব স্থাপন করা হবে।
চকরিয়া (কক্সবাজার) : কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার রাত আনুমানিক ১টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন বরইতলী ইউনিয়নের আবদুল মজিদের ছেলে তৌসিফ উদ্দিন (১৩) এবং কাজলের মেয়ে রুমি আক্তার (১১)। স্থানীয় সূত্র জানায়, গভীর রাতে টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে তাদের বসতঘরের উপর পড়ে। এতে তারা মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় মাটির নিচ থেকে তাদের উদ্ধার করলেও ততক্ষণে দুজনই মারা যায়। এ ঘটনায় একই এলাকার আব্দুল জলিলের স্ত্রী ও কন্যা আহত হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার দুই শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে তিনি ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ণ দেব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এদিকে টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় বন্যার পানি দ্রুত বিস্তার লাভ করায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক, ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক স্থানে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট। উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল এখনো বন্যার পানির নিচে রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবকরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে- এমন আশঙ্কায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাইকিং করা হচ্ছে। একইসঙ্গে অতি প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার জন্যও সতর্ক করা হয়েছে।
কক্সবাজার : টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজার ও বান্দরবানে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবানের লামা উপজেলায় পৃথক দুটি পাহাড়ধসে একই এলাকার পাঁচজন এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চকরিয়ার ঘটনায় আহত হয়েছেন তাদের মা। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোররাতে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায় পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহতরা হলেন- মো. ইউনুস (৪০), তার স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫) ও তাদের পাঁচ বছর বয়সি ছেলে মো. সোলেমান। অপর ঘটনায় নিহত হয়েছেন স্বামী-স্ত্রী মো. জুয়েল (৩৪) ও কুলছুমা আক্তার (২৫)। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ভোরের দিকে পাহাড়ধসের পর মানুষের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে। বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার জানান, একই এলাকায় পৃথক দুই ঘটনায় শিশুসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অন্যদিকে চকরিয়া উপজেলার মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড়ধসে একটি পরিবারের মা ও তার দুই সন্তান মাটিচাপা পড়েন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুই শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত মায়ের চিকিৎসা চলছে। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, ভোররাতে পাহাড়ধসের খবর পেয়ে প্রশাসন ঘটনাস্থলে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে নিহত দুই শিশুর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আহত মাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে টানা বর্ষণে লামাসহ বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরো বেড়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় জনজীবন ও সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হলেও অনেকেই এখনো সেখানে যেতে অনাগ্রহী। এছাড়া টানা বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলার সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। কক্সবাজার জেলায় গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় মিলিয়ে মোট ১৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা আরো দুই-তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীরা চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানি বৃদ্ধিতে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু কিছু এলাকায় মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জে গত দুই দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বৃদ্ধি পাচ্ছে নদ-নদীর পানি। এরই মধ্যে খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। একটি বাঁধে দেখা দিয়েছে ভাঙন। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে খোয়াই নদীর পানি চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা পয়েন্টে বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার এবং শহরের মাছুলিয়া পয়েন্টে ২১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুশিয়ারা নদীর আজমিরীগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বানিয়াচং উপজেলার খোয়াই নদীর রামপুর বাঁধ ভেঙে হাওরে প্রবেশ করেছে পানি। এ ছাড়া সুতাং, করাঙ্গি ও সোনাই নদীতেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীতীরবর্তী এলাকা ও হাওরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেখা দিয়েছে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা। হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, উজান ও দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের কারণে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত বন্যার কোনো পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পূর্বাভাস পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে।
বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম) : চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার জ্যৈষ্ঠপুরা পাহাড়ে নিজ লেবুবাগানে কাজ করতে যাওয়ার পথে পাহাড়ি ঢলে ভেসে মো. দিদার আলম (২২) নামে এক দিনমজুর নিখোঁজ হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে উপজেলার শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের জ্যৈষ্ঠপুরা পাহাড় এলাকার ভান্ডারজুরী খালের লেচুবারিচা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ দিদার আলম উপজেলার শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জ্যৈষ্ঠপুরা গুচ্ছ গ্রামের মৃত ইলিয়াসের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, টানা বৃষ্টির মধ্যে নিজ লেবুবাগানে কাজ করতে যাওয়ার সময় ভান্ডারজুরী খালের লেচুবারিচা এলাকায় খাল পারাপারের চেষ্টা করেন দিদার আলম। এ সময় পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট তীব্র স্রোতে তিনি পানিতে তলিয়ে যান। খবর পেয়ে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান মেলেনি। শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হাসান চৌধুরী বলেন, ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় লোকজন নিখোঁজ দিদার আলমকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান ফারুক বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
রাঙামাটি : সমতলের শহরের মানুষ যখন বৃষ্টিকে উপভোগ করতে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়, ঠিক সে সময়ই পাহাড়ের মানুষ আতঙ্কে থাকেন- কখন প্রবল বৃষ্টিপাতে প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি ডুবে যায়, আর পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটে। টানা ভারী বর্ষণে প্লাবিত হয়েছে রাঙামাটির বেশ কয়েকটি উপজেলা। জেলার জুরাছড়ি, বরকল, বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম টানা বর্ষণের কারণে প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে দুর্গম বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম। টানা বর্ষণের কারণে রাজস্থলী-ফারুয়া সীমান্তের অরুণোদয় ভিউ পয়েন্ট এলাকায় পাহাড়ধসে পুরো সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফারুয়া বাজার থেকে ফারুয়ার সাইচল এবং জুরাছড়ি উপজেলার দুমদুম্যা ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বাজারগামী সীমান্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এদিকে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এখনো কোনো ধরনের ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। বৃষ্টির কারণে ফারুয়া ইউনিয়নের ফারুয়া বাজার, গোয়াইনছড়ি, চাইন্দ্যাছড়ি, শুকরছড়ি, এগুজ্যাছড়ি, যমুনাছড়ি, উলুছড়ি, তক্তানালা ও ওরাছড়িসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ১২ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, রাস্তা ও কৃষিজমি। শুধু তাই নয়, ডুবে গেছে পাড়াকেন্দ্রসহ ধর্মীয় উপাসনালয়। সুদত্ত তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফারুয়াবাসীর কাছে বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক। বর্ষাকাল মানেই আতঙ্ক। অন্যরা যখন বৃষ্টিকে উপভোগ করে, তখন আমরা মনে মনে ভাবি বৃষ্টির পানিতে কখন যে বাড়িঘর ডুবে যায়। তবে গতকালের তুলনায় একটু একটু করে পানি কমতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।
ফারুয়ার বাসিন্দা উত্তম কুমার তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফারুয়ার প্রায় ৩ হাজার ৪০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছে। টানা বর্ষণে ফারুয়ার বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। রাস্তা ডুবে গিয়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। দোকানপাট ও ঘরবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। এ সময় প্রশাসন থেকে শুরু করে সব মহলের সহযোগিতা প্রয়োজন। ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘ফারুয়ার বিভিন্ন গ্রামে এখন হাঁটুসমান পানি। এতে প্রায় ১ হাজারের বেশি পরিবার প্লাবিত হয়েছে। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর ও দোকানপাট ডুবে গেছে। এভাবে টানা বৃষ্টিপাত হলে ফারুয়া ইউনিয়নের ক্ষয়ক্ষতি আরো বাড়তে পারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘বিলাইছড়ি উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষ টানা বর্ষণে প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ফারুয়া ইউনিয়নে ১২ হাজারের বেশি মানুষ বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয়েছেন। পানি বেড়ে যাওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে ইউপি চেয়ারম্যানকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
"








































