দিলরুবা খাতুন, মেহেরপুর
গাংনীতে খোলা ঘরে শিশুদের পাঠদান

সকালের রোদ তখন ধীরে ধীরে চড়া হচ্ছে। টিনের চালার নিচে ছোট ছোট শিশুরা বই-খাতা নিয়ে বসে আছে। কেউ বর্ণমালা লিখছে, কেউ শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করছে। তাদের পাশেই বসে আছেন কয়েকজন মা। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে কোনো উঠান বৈঠক চলছে। কিন্তু না, এটা একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের ‘ভাটপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’র প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এভাবেই খোলা টিনশেডের নিচে পাঠ নিতে হয়। বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় কোমলমতি শিশুদের জন্য কোনো আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা নেই। আর প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও মাত্র দুটি কক্ষে পালাক্রমে ক্লাস করতে হয়।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চারদিক খোলা একটি টিনের চালার নিচে চলছে মাটির উপর ত্রিপল বিছিয়ে নার্সারি শ্রেণির পাঠদান। শিক্ষার্থীদের অভিভাবক মেয়েরা কেউবা বসে, কেউবা দাঁড়িয়ে আছেন। বাতাস এলে বই-খাতা উড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, রোদ বাড়লে গরমে অস্বস্তি বাড়ে। তবুও শিশুদের চোখে শেখার আগ্রহের কোনো কমতি নেই।
প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থী সায়মা বলে, ‘আগে আমরা গাছের নিচে ক্লাস করতাম। এখন টিনের নিচে পাকা সানে বসি’। সায়মার এই ছোট্ট কথার মধ্যেই যেন ফুটে ওঠে বিদ্যালয়টির বাস্তবতা। গাছতলা থেকে টিনশেডে আসা হয়েছে, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ শ্রেণিকক্ষের স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
শিশু শিক্ষার্থী সায়মার মা নুর জাহানের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে শিশুর প্রথম বিদ্যালয় জীবনে। অথচ সেই বয়সেই যদি শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে টিনের চালার নিচে বসে পাঠ নিতে হয়, তাহলে তা শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে আসে। শিশুদের স্বপ্ন খুব বড় নয়। তাদের চাওয়া শুধু একটি শ্রেণিকক্ষ- যেখানে নিশ্চিন্তে বসে অ আ ক খ শিখতে পারবে, বৃষ্টি এলে বই-খাতা গুটিয়ে দৌড়াতে হবে না, আর মায়েদেরও উদ্বেগ নিয়ে পাশে বসে থাকতে হবে না।
স্থানীয় অভিভাবকদের ভাষ্য, সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে তারা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে পাঠান। কিন্তু একটি সরকারি বিদ্যালয়ে শিশুদের খোলা পরিবেশে ক্লাস করতে দেখে তাদের কষ্ট হয়। বৃষ্টি বা বৈরী আবহাওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে শিশুরা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম জানান, গত বছর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে গাছের নিচে ক্লাস নিতে দেখে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। পরে তার উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের জন্য অস্থায়ী এই টিনশেড নির্মাণ করা হয়। তিনি বলেন, এটি আমাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের সংকট এতটাই প্রকট যে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও পালা করে ক্লাস নিতে হয়। নতুন কক্ষ নির্মাণ না হলে সমস্যার সমাধান হবে না।
"








































