প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

প্রথম কলের গাড়ি...

১৯০৩ সালের জানুয়ারি মাসে দিল্লিতে বসেছিল দরবার। সেদিন ভারতবর্ষের সম্রাট হিসেবে অভিষেক হয়েছিল সপ্তম এডওয়ার্ডের। পুরো দুই সপ্তাহজুড়ে চলছিল আয়োজন। এত জাঁকজমক ভূ-ভারতে কেউ কোনো দিন দেখেনি। দিল্লির শহরের প্রান্তে ধূসর এক প্রাঙ্গণ মাসখানেকের ভেতরেই ঢেকে গিয়েছিল জমকালো সব তাঁবুতে। এ যেন সম্পূর্ণ আধুনিক এক শহর! কী ছিল না সেখানে? দিনভর চলছিল নানা প্রদর্শনী, গান-নাচের আসর, আর সন্ধ্যা নামলে আতশবাজির উৎসব। ভাইসরয় লর্ড কার্জন নিজে সবকিছুর তদারক করেছিলেন, আয়োজনে কোনো কমতি ছিল না। সম্রাটের অভিষেক উপলক্ষে ভারতবর্ষের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রাজ্যগুলোর রাজা, মহারাজারা সবাই একত্র হয়েছিলেন। এ যেন মূল্যবান পোশাক, অলংকার আর লোকলস্কর নিয়ে আভিজাত্য আর বিলাসিতা দেখানোর এক প্রদর্শনী!

সেদিন দিল্লিতে নওয়াব সলিমুল্লাহর সময় ভালো কাটল। কত নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো, কত রাজা-মহারাজার সঙ্গে প্রথমবারের মতো দেখা হলো। এ সুযোগ তো অভূতপূর্ব। মজার বিষয় হলো, প্রদর্শনীতে নতুন নতুন নানা পণ্য দেখার সুযোগ মিলেছিল। যারা এসব পণ্য তৈরি আর বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারা আয়োজনকে নিজেদের ব্যবসা প্রসারের জন্য ভালো সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে ব্যস্ত ছিলেন। তেমনই এক ইংরেজ গাড়ি ব্যবসায়ী মন্টাগো গ্রাহাম হোয়াইটের সঙ্গে সলিমুল্লাহর সখ্য তৈরি হয়। মাত্র ২৬ বছর বয়সের এই তরুণের সঙ্গে আলাপে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। নিজের ব্যবহারের জন্য কলের গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন নওয়াব সলিমুল্লাহ। কালের পরিক্রমায় নবাব সলিমুল্লাহর কেনা সেই গাড়ি হয়ে উঠল ইতিহাসের অংশ, ঢাকার প্রথম কলের গাড়ি বা মোটরগাড়ি হিসেবে তার স্বীকৃতি মিলল। নওয়াবের গাড়ি কেনার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেল মন্টাগো নামের সেই যুবকের নাম। নওয়াবের অনুরোধে মর্স গাড়ি চালিয়ে সে বছরই মন্টাগো এলেন ঢাকায়। ঢাকার মানুষের সেই প্রথম কলের গাড়ি দেখা। মন্টাগোর তত্ত্বাবধানে বছর শেষে আহসান মঞ্জিলে পৌঁছে গেল নওয়াব সলিমুল্লাহর কেনা তিনটি গাড়ি।

এ ঘটনার তিন দশকেরও বেশি কাল পরে ১৯৩৫ সালে মন্টাগো প্রকাশ করেন তার আত্মজীবনী At the Wheel Ashore & Afloat : Reminiscences of Motoring, Yachting and Travel over a Period of Forty Years; স্মৃতিচারণায় উঠে আসে ভারতের দিনগুলোর কথা, ঢাকা সফরের বিবরণ আর নওয়াব সলিমুল্লাহর সঙ্গে সখ্যের কথা। মন্টাগোর স্মৃতিকথা আর এর সঙ্গে ওই সময়কার পত্রপত্রিকায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে লেখা এই নিবন্ধে উঠে এসেছিল ঢাকার প্রথম মোটরগাড়ি এবং একে ঘিরে ঢাকাবাসীর অভিজ্ঞতার কথা।

সরু, আঁকাবাঁকা গলিপথের দুই ধারে গড়ে উঠেছে কাঁচাপাকা ঘরবাড়ি। পুরো ঢাকা শহর অনেক ছোট ছোট মহল্লায় বিভক্ত। গাড়ি বলতে এ শহরের মানুষ চেনে ঘোড়ার গাড়ি আর মোষের গাড়ি। প্রধান সড়ক ছাড়া কোথাও দুটো গাড়ি পাশাপাশি চলার মতো জায়গা নেই; সড়কে জট লেগে থাকত। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল ধুলো।

হঠাৎ মোটরগাড়ি দেখে ঢাকার মানুষ থমকে দাঁড়িয়েছিল। এমন অদ্ভুত গাড়ি তো তারা কোনো দিন দেখেনি। সাধারণের মনে প্রশ্নÑ এই গাড়ি টানছে কে? কলে টানা গাড়ি বলতে তারা চেনে রেলগাড়ি, সে তো দৈত্যের মতো বড় বাষ্পচালিত ইঞ্জিন দিয়ে চলে। কিন্তু এই ছোট্ট গাড়িটা চালানোর শক্তি কোথা থেকে এল? প্রথমবারের মতো মোটরগাড়ি দেখে কেউ ভয়ে দূরে সরে গেল, আবার কেউ গাড়িকে ঘিরে দাঁড়াল। ক্রমাগত ভেঁপু বাজিয়ে আর চিৎকার করে লোক সরিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলল নওয়াববাড়ির দিকে। এ সময়ে ইসলামপুর রোডে এক ঘোড়ার গাড়ির কারণে নতুন বিপত্তি হলো। সূত্র : আহসান মঞ্জিল ও ঢাকার নওয়াব ঐতিহাসিক রূপরেখা।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close