গাজী মো. শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ

  ১ ঘণ্টা আগে

সিরাজগঞ্জে মাদকের করাল গ্রাস, প্রশাসনের অভিযানে এক মাসে আটক ৪৫

প্রতীকী ছবি

সিরাজগঞ্জ পৌরসভা ও সদর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাদকের বিষাক্ত থাবা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজার মতো মারাত্মক সব মরণ নেশার ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। মাদকের এই বিষাক্ত কালো ধোঁয়া যুবসমাজকে ধ্বংসের দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বিপন্ন করে তুলছে একের পর এক পরিবারকে। বিশেষ করে মরণনেশা ইয়াবা সেবনের ফলে মাদকাসক্ত যুবকদের পরিবারগুলো মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

গ্রামীণ অঞ্চলেও ছড়িয়েছে মাদকের সিন্ডিকেট

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার ১৫টি ওয়ার্ডেই মাদকের কেনাবেচা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শুধু পৌর এলাকাই নয়, মাদক ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এখন জাল বিছিয়েছে সদর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও। উপজেলার রতনকান্দি, বাগবাটি, ছোনগাছা, খোকশাবাড়ী, বহুলী, শিয়ালকোল, কালিয়াহরিপুর ও সয়দাবাদ ইউনিয়নের আনাচে-কানাচে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা। সহজলভ্যতার কারণে দিন দিন মাদকাসক্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, যার বড় একটা অংশই তরুণ ও যুবসমাজ।

স্পট বদলে সক্রিয় ভ্রাম্যমাণ মাদক কারবারিরা

জানা যায়, শহরতলীর কতিপয় পবিত্র স্থানের আনাচে-কানাচে চলন্ত মোটরসাইকেল ও ঘাপটি মেরে থাকা যুবকদের মাধ্যমে মাদক হাতবদল হয়। সয়াধানগড়া শহীদগঞ্জ ও শাহেদনগর সীমান্তবর্তী এলাকা, কাঠের পুল, পুটিয়াবাড়ী, মাহমুদপুর রেলকলোনি, সয়াগোবিন্দ, স্পিনিং অ্যান্ড কটন মিল, নয়াচর, ফুলবাড়ী, জানপুর, ব্যাংকপাড়া, ছোনগাছা, ফুলকোচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাগবাটি পুনর্বাসন, পিপুলবাড়ীয়া, খোকশাবাড়ী, ব্রাহ্মণ বয়ড়া, রতনকান্দির চিলগাছা ও কুড়ালিয়া এবং কালিয়াহরিপুর ও সয়দাবাদ পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ মাদক কারবারিদের তৎপরতা বেড়েই চলেছে।

মাদক প্রতিরোধে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের 'জিরো টলারেন্স'

মাদকের এই ভয়াবহ আগ্রাসন রোধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। যুবসমাজকে রক্ষা করতে এবং মাদকের চেইন ভেঙে দিতে ইতিমধ্যেই তারা মাঠে নেমেছেন। রাজনৈতিক মহলের পক্ষ থেকে মাদক প্রতিরোধে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করে বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচরাণা চালানো হচ্ছে। একই সাথে মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের সামাজিক ও political-ভাবে বয়কট করার ডাক দিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।

প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত

রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন মাদক নির্মূলে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সদর থানা পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে মাদক বিক্রি ও সেবনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অনেককে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদানসহ জেলহাজতে প্রেরণ করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল হাসানের সরাসরি নেতৃত্বে শহর, শহরতলী এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন পর্যায়ে দিনরাত মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। এই সাঁড়াশি অভিযানের ফলে অনেক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী ইতিমধ্যে আইনের আওতায় এসেছে এবং এই কার্যক্রম বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে।

"মাদকের সাথে কোনো আপস নেই" বললেন ওসি

মাদকবিরোধী এই অভিযান সম্পর্কে সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল হাসান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, "মাদকের সাথে কোনো আপস নেই। মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবনকারীদের একমাত্র পরিচয়—তারা অপরাধী। এদের পক্ষে সমাজের কোনো স্তর থেকেই কোনো ধরনের তদবির বা সুপারিশ মেনে নেওয়া হবে না। যুবসমাজকে রক্ষায় এবং সিরাজগঞ্জকে মাদকমুক্ত করতে আমাদের এই সাঁড়াশি অভিযান আরও বেগবান করা হবে।"

তিনি আরও জানান, বিগত ১ মাসে মাদক কারবারি ও সেবনকারী মিলে মোট ৪৫ জনকে আটক করা হয়েছে।

সামাজিক প্রতিরোধ ও সুস্থ বিনোদনের দাবি

স্থানীয় জনগণ প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে তারা মনে করেন, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে মাদক পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং যুবসমাজের মানসিক বিকাশের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়