চার দশকেও দেখা যায়নি জলবায়ুর এমন উগ্র রূপ, মৃত্যু ছুয়েছে ৩০

প্রকৃতি যেন ধারণ করেছে তার চরম সংহারী রূপ! টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি এক ভয়াবহ ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দেওয়া সর্বশেষ আতঙ্কজনক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০টি প্রধান নদ-নদীর পানি বুক কাঁপিয়ে বর্তমানে বিপৎসীমার আশঙ্কাজনক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। সুরমা, কুশিয়ারা, মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর রুদ্রমূর্তিতে তলিয়ে গেছে মাইলের পর মাইল লোকালয়।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দেশের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে। অবিরাম বৃষ্টির তোড়ে যেকোনো মুহূর্তে মাটির পাহাড় ধসে পড়ার মরণফাঁদ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্তহিম করা পাহাড়ধসে অন্তত ৩০ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি—এবারের বর্ষার এই উগ্র ও হিংস্র রূপ কেবল অস্বাভাবিক নয়, বরং গত চার দশকের সমস্ত রেকর্ডকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, অন্ধকারে লাখো মানুষ
দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি ধসে পড়েছে, ফলে লাখ লাখ মানুষ এখন ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। চারিদিকে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র হাহাকার, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের মহামারি ডেকে আনতে পারে। লাখো মানুষ এখন বুকসমান পানিতে বন্দি হয়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। সবচেয়ে ভীতিপ্রদ বিষয় হলো, বহু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ত্রাণ পৌঁছানো তো দূরের কথা, উদ্ধারকারী দলগুলোই সেখানে পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে। দুর্গম অঞ্চলের মানুষকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে এখন জরুরি ভিত্তিতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নৌযান ও বিমান বাহিনীর লাইফ-সেভিং হেলিকপ্টার নামানোর চরম তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকৃতির এই অসহিষ্ণুতার কারণ কী?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রহমান শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, জুলাই মাসে একদিনে এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত গত ৪০ বছরের ইতিহাসে এক বিরল ও অভূতপূর্ব ঘটনা। এর আগে ১৯৮৩ সালের ৫ জুলাই সর্বোচ্চ ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। আর এবার গত বুধবার শুধু চট্টগ্রামেই ৩৯৪ মিলিমিটার এবং শুক্রবার সাতক্ষীরায় ২২৭ মিলিমিটারের মতো আকাশভাঙা বৃষ্টিপাত প্রমাণ করে যে প্রকৃতি কতটা অসহিষ্ণু ও মারাত্মক হয়ে উঠেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর থাবা ও ‘এল নিনো’র অভিশপ্ত প্রভাবেই এই স্বল্প সময়ে এমন অস্বাভাবিক ও প্রলয়ংকরী বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকাও পানির নিচে
এই জলবায়ু তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি রাজধানী ঢাকাও। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, মিরপুর, মালিবাগ, শান্তিনগরসহ ঢাকার মূল এলাকাগুলো এক লহমায় পানির নিচে তলিয়ে যায়। হাঁটু থেকে কোমরপানিতে ডুবে যায় প্রধান সড়কগুলো, থমকে দাঁড়ায় যান চলাচল। ঘরের ভেতর এবং বিভিন্ন নামী মার্কেটে নোংরা পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হওয়ায় ব্যবসায়ীদের চোখে এখন কেবলই অন্ধকার।
সামনে আরও বড় বিপদের সংকেত!
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান এক ভয়াবহ বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরো চরম অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, আগামী ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে এই আকাশভাঙা অতিভারী বর্ষণ চলতেই থাকবে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বঙ্গোপসাগরে নতুন করে একটি লঘুচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির গভীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগকে পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
ইতিমধ্যে দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এবং নদীবন্দরগুলোতে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি রাখা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, দেশের আট বিভাগেই এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বহাল থাকবে।
প্রশাসনের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও বিশেষজ্ঞদের চরম হুঁশিয়ারি
এই মহাবিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টা কন্ট্রোল রুম খোলা রেখে নদ-নদীর পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারী লোকজনকে জোরপূর্বক হলেও দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার এবং উদ্ধারকারী দলগুলোকে 'সর্বোচ্চ রেড অ্যালার্ট' বা প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা এক চরম সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, এই টানা বর্ষণ যদি আর কয়েকদিন স্থায়ী হয়, তবে বন্যা ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এবং পানিবাহিত প্রাণঘাতী রোগের মহামারি পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে। তাই আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
পিডিএস/এমএইউ









































