মোহাম্মদ আবু ইউসুফ
টাইব্রেকার ট্র্যাজেডি: আগে নাকি পরে, কোন শটে নিশ্চিত জয়?

নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়েও যখন ফুটবল ম্যাচের ফয়সালা হয় না, তখন ভাগ্যলিপি নির্ধারণের শেষ যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় পেনাল্টি শুটআউট। এই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে ফুটবল রোমাঞ্চের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নটি সামনে আসে—কোন দল প্রথম শটটি নেবে? ফুটবলের চিরন্তন ব্যাকরণ বলত, টাইব্রেকারে যারা প্রথমে শট নেয়, মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা তাদের কোর্টেই থাকে। শুরুতেই বল জালে জড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেওয়াই ছিল প্রচলিত কৌশল। তবে চলমান বিশ্বকাপের মঞ্চ যেন দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই চেনা মিথ বা বিশ্বাসকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
উল্টে গেছে বিশ্বকাপের চেনা সমীকরণ
ফুটবল পরিসংখ্যানের চুলচেরা বিশ্লেষণকারী স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘অপ্টা অ্যানালিস্ট’-এর সাম্প্রতিক উপাত্ত ফুটবল বোদ্ধাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। তাদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, এবারের বিশ্বকাপের এখন পর্যন্ত হওয়া ৪টি টাইব্রেকারের সব কটিতেই শেষ হাসি হেসেছে পরে শট নেওয়া দলটি। আরও অবিশ্বাস্য তথ্য হলো, বৈশ্বিক এই মহোৎসবের শেষ ১৫টি শুটআউটের মধ্যে ১৩টিতেই জিতেছে দ্বিতীয় দফায় শট নেওয়া দল। অর্থাৎ সাফল্যের হার প্রায় ৮৭ শতাংশ! এই স্রোতের বিপরীতে ব্যতিক্রম ছিল শুধু ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ, যেখানে মরক্কো ও ক্রোয়েশিয়া প্রথমে পেনাল্টি নিয়েও যথাক্রমে স্পেন ও ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছিল।
ইতিহাস বনাম বর্তমানের হাওয়া
বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাস অবশ্য বর্তমানের মতো এতটা একপেশে গল্প বলে না। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত ফুটবল মহাযজ্ঞে মোট ৩৫টি টাইব্রেকারের ফয়সালা হয়েছিল, যার মধ্যে ১৮ বার জিতেছিল দ্বিতীয় পেনাল্টি নেওয়া দল। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল প্রায় ফিফটি-ফিফটি। তবে চলতি আসরের আরও ৪টি ম্যাচ যুক্ত হওয়ায় ৩৯টি শুটআউটের মধ্যে পরে শট নিয়ে জেতার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২টিতে, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৫৬ দশমিক ৪। সামগ্রিক খতিয়ান এখনো পুরোপুরি একপেশে না হলেও সাম্প্রতিক প্রবণতা স্পষ্টভাবেই দ্বিতীয় শট নেওয়া দলের দিকে ঝুঁকছে।
অথচ এক সময় চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশ্বকাপের প্রথম ২৪টি টাইব্রেকারের মধ্যে মাত্র ৯ বার পরে শট নেওয়া দল জিতেছিল। আর সেই পরিসংখ্যান দেখেই ফুটবল বিশ্বে ‘আগে শট নেওয়াই নিরাপদ’—এমন ধারণার ভিত মজবুত হয়েছিল, যা আজ সময়ের বিবর্তনে ক্ষয়ে যাচ্ছে।
ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের ভিন্ন চিত্র
শুধু বিশ্বকাপ নয়, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা ইউরোর ইতিহাসেও দেখা গেছে আগে বা পরে শট নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অলৌকিক ব্যবধান নেই। ইউরোর ২৫টি টাইব্রেকারের মধ্যে ১২ বার জিতেছে পরে শট নেওয়া দল, যা প্রায় সমান সমান।
আবার ক্লাব ফুটবলের দুনিয়ায় হিসাবটা বেশ গোলমেলে। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের (সাবেক ইউরোপিয়ান কাপ) ইতিহাসে ৪২টি শুটআউটের মধ্যে মাত্র ১৬ বার জিতেছে পরে শট নেওয়া দল; এখানে আগে শট নেওয়া দলগুলোর আধিপত্যই স্পষ্ট। তবে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ফুটবলে আবার উল্টো হাওয়া। ২০১৩-১৪ মৌসুমের পর এফএ কাপে হওয়া ৭৫টি টাইব্রেকারের ৪৩টিতেই জিতেছে পরে শট নেওয়া দল। এমনকি গত মৌসুমে ১৭টি শুটআউটের ১২টিতেই বাজিমাত করেছে পরে আসা দলগুলো। অন্যদিকে, একই সময়ে লিগ কাপের ২০৭টি সাধারণ টাইব্রেকারের মধ্যে ১০৪টিতে জিতেছে দ্বিতীয় দল। বিশাল এই পরিসংখ্যানই মূলত প্রমাণ করে, বাস্তবে দুই দলের সুযোগ আসলে সমানে সমান।
প্রথম শটের মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমে শট নেওয়ার সুবিধায় যেমন রোমাঞ্চ আছে, তেমনি লুকিয়ে আছে এক মরণফাঁদ। প্রথম শটেই গোল হলে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায় ঠিকই, কিন্তু সেটি কোনোভাবে মিস হলে পুরো দলের ওপর এক লহমায় হিমালয়সম মানসিক চাপ চেপে বসে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ—বিশ্বকাপের শেষ ১৫টি টাইব্রেকারের ৭টিতেই প্রথম শট নেওয়া দল শুরুতেই গোল করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রতিবারই তারা ম্যাচটি হেরে মাঠ ছেড়েছে। বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম শট মিস করার পরও ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জেতার কীর্তি আছে মাত্র দুটি দেশের—১৯৯৪ সালে সুইডেন এবং ২০০৬ সালে ইউক্রেন।
সালাহর সেই সাহসী চাল
চলতি বিশ্বকাপেও অধিনায়কদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে একটি চমৎকার ও কৌতূহলী তথ্য সামনে এসেছে। টুর্নামেন্টের ৪টি টাইব্রেকারের মধ্যে কেবল একবারই টসে জিতে কোনো অধিনায়ক পরে শট নেওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিশরের সেই ম্যাচে এই ভিন্নধর্মী চালটি দিয়েছিলেন মোহাম্মদ সালাহ এবং তাঁর দল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে। বাকি তিন ম্যাচের অধিনায়কেরা আদিম বিশ্বাসে ভর করে আগে শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও দিনশেষে তিনজনেই ডুবেছেন হারের গ্লানিতে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এখানে ‘কনফারমেশন বায়াস’ বা কোনো ধারণার প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের মনস্তত্ত্ব কাজ করতে পারে। কোনো দল যদি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে পরে শট নেওয়াই তাদের জন্য পয়মন্ত, তবে সেই আত্মবিশ্বাসই চাপের মুখে তাদের স্নায়ু স্থির রাখতে টনিক হিসেবে কাজ করে।
দক্ষতাই শেষ কথা
দীর্ঘ সময়ের এই চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে ফুটবল পরিসংখ্যানবিদ ও বিশেষজ্ঞদের শেষ রায় কিন্তু একটাই—টসের কয়েন কোন পিঠে পড়ল কিংবা কে আগে বা পরে শট নিল, আধুনিক ফুটবলে তা মোটেও মূল নিয়ামক নয়। টাইব্রেকার জয়ের আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে পেনাল্টি শুটারের নিখুঁত গোল করার দক্ষতা, গোলরক্ষকের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠার মানসিক দৃঢ়তা এবং চাপের মুখে স্নায়ু ধরে রাখার ক্ষমতার ওপর। কারণ, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্যটি এখনো অপরিবর্তিত—কে আগে শট নিল তার চেয়ে দিনশেষে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কে জাল বেশি কাঁপাল!
পিডিএস/এমএইউ









































