মোঃ রফিকুজ্জামান, মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা)
নেত্রকোনায় সাড়ে ৫ বছরে বজ্রপাতে ৬০ জনের প্রাণহানি

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বর্ষা মৌসুম এলেই কৃষক, জেলে ও দিনমজুরদের মধ্যে নতুন করে একটি তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সেই আতঙ্কের নাম ‘বজ্রপাত’। আকাশে কালো মেঘ আর বৃষ্টির সঙ্গে মুহূর্তেই নেমে আসে প্রাণঘাতী বজ্রপাত। জীবিকার তাগিদে খোলা মাঠ ও হাওরে কাজ করতে গিয়ে প্রতিবছরই এখানে প্রাণ হারাচ্ছেন বহু মানুষ।
রেকর্ড ছাড়িয়েছে মৃত্যুর সংখ্যা
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সাড়ে পাঁচ বছরে জেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬০ জন। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৫ জন, ২০২৫ সালে ১২ জন এবং চলতি ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই কৃষক, জেলে ও নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ, যারা জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মাঠ কিংবা হাওরে কাজ করতে বাধ্য হন। সাম্প্রতিক জুন মাসেই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক বজ্রপাতের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে যেসব এলাকা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেলার খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, পূর্বধলা ও নেত্রকোনা সদর উপজেলার হাওরাঞ্চল বজ্রপাতের সবচেয়ে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ধান কাটা, মাছ ধরা, গরু চরানো কিংবা জলাশয় থেকে জাল তুলতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন এসব এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ। স্থানীয় কৃষক ও জেলেরা জানান, জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি জেনেও তাদের বাধ্য হয়ে মাঠে কিংবা হাওরে যেতে হয়। অনেক সময় হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে বজ্রপাত শুরু হয়। কিন্তু বিস্তীর্ণ হাওরে আশেপাশে কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার মতো জায়গা বা স্থাপনা না থাকায় প্রতিবছরই এমন অকাল প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
বজ্রপাত বৃদ্ধির বৈজ্ঞানিক কারণ
নেত্রকোনা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ইনচার্জ মোঃ মামুন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মেঘ তৈরির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। এছাড়া বৈশ্বিক ‘এল নিনো’র (El Niño) বড় প্রভাব রয়েছে এর পেছনে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, বজ্রপাত মূলত সৃষ্টি হয় ‘কিউমুলোনিম্বাস’ (Cumulonimbus) মেঘ থেকে, যাকে সংক্ষেপে ‘সিবি মেঘ’ (CB Cloud) বলা হয়। বর্ষা-পূর্ববর্তী (Pre-monsoon) সময়ে ভৌগোলিক কারণে এই মেঘ হাওর অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি তৈরি বা ফর্ম হয়, যা অন্য অঞ্চলে এতটা দেখা যায় না। এই বজ্রমেঘের ভেতরে বিশাল বরফের স্তূপ বা আইস ক্রিস্টাল থাকে, যার পারস্পরিক ঘর্ষণে মেঘের ভেতরে পজিটিভ ও নেগেটিভ ইলেকট্রিসিটি (বৈদ্যুতিক চার্জ) তৈরি হয় এবং তা থেকে প্রবল বজ্রপাত ঘটে। তিনি আরও জানান, আগে যেভাবে প্রাকৃতিকভাবে বনজঙ্গল ও গাছপালা ছিল, তা এখন উজাড় হয়ে গেছে। এর প্রতিকার হিসেবে হাওরাঞ্চলে বেশি বেশি তাল গাছ বা এই জাতীয় উঁচু গাছপালা রোপণ এবং বনায়ন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
আশ্রয়কেন্দ্র বা 'শেল্টার জোন' নির্মাণের প্রস্তাব
বজ্রপাতের এই ভয়াবহ দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে জেলা প্রশাসন। নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মোঃ মুশফিকুর রহমান জানান, তারা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন যে হাওরের বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে শুধু বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করাই মানুষের সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত নয়। তার চেয়ে বরং যদি একটি ‘শেল্টার জোন’ বা সুনির্দিষ্ট আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করা যায়, তবে সেটি অনেক বেশি উপকারী হবে।
জেলা প্রশাসকের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এটি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ। যেখানে বজ্রনিরোধক দণ্ডের পাশাপাশি একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল থাকবে, যাতে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া (Inclement Weather) বা আকস্মিক বজ্রপাত শুরু হলে মাঠের কৃষক ও জেলেরা দ্রুত সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন। এই শেল্টার জোনে প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম বা ইকুইপমেন্টসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও থাকবে, যা সাধারণ মানুষকে একটি স্থায়ী সুরক্ষা দিতে পারবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এবং ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন বলে তিনি জানান। তবে এই প্রকল্পের কারিগরি দিক এবং নির্দিষ্ট এলাকা মূল্যায়নের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের একটি ‘টেকনিক্যাল টিম’ এসে সরজমিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Assess) করে চূড়ান্ত নির্ধারণ করবে। জেলা প্রশাসক আরও জানান, সামগ্রিক সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রশাসন আরও গভীরভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সচেতনতা বৃদ্ধির তাগিদ
এদিকে সচেতন মহল ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, বিল-হাওর কিংবা জলাশয়ে অবস্থান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি রেডিও বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। আবহাওয়া পূর্বাভাস মেনে চলা এবং বজ্রপাত শুরু হওয়া মাত্রই দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে এই অকাল মৃত্যু অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব।
পিডিএস/এমএইউ









































