কৃষিবিদ মনোয়ারুল ইসলাম

  ১ ঘণ্টা আগে

কৃষিতে বিপ্লবের সম্ভাবনা 

পরিকল্পিত চাষাবাদ ও আধুনিকায়নেই লুকিয়ে আছে সমৃদ্ধির চাবিকাঠি

​বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষিনির্ভর দেশ। এ দেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ জীবনযাত্রা এবং খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে কৃষি খাতটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে কৃষিক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, যার ছোঁয়া লেগেছে আমাদের দেশেও। তবে এই ধারাকে আরও বেগবান করতে পরিকল্পিত চাষাবাদ এবং কৃষির সামগ্রিক আধুনিকায়ন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। এটি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে একটি প্রকৃত কৃষি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

সনাতন পদ্ধতি বনাম আধুনিক সচেতনতা ​বর্তমানে আমাদের দেশের কৃষকরা আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন ও প্রযুক্তিমনস্ক। তারা উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের প্রতি দিন দিন আগ্রহী হচ্ছেন। তবে বাস্তব চিত্র হলো, এখনও দেশের অনেক অঞ্চলে কৃষিকাজ পুরোনো ও সনাতন পদ্ধতিতেই পরিচালিত হচ্ছে। প্রাচীন পদ্ধতির ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ ও শ্রম বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেশব্যাপী পরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

পরিকল্পিত চাষাবাদ ও ফসল নির্বাচন ​সহজ কথায় পরিকল্পিত চাষাবাদ বলতে বোঝায়—মাটি, আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বর্তমান বাজার চাহিদা বিবেচনায় রেখে সঠিক ফসল নির্বাচন এবং সময়োপযোগী কৃষি কার্যক্রম পরিচালনা করা। কোন অঞ্চলে কোন ফসলের ফলন বেশি ভালো হয়, কোন মৌসুমে কী চাষ করলে বাজারমূল্য ভালো পাওয়া যাবে—এসব বিষয় বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশ্লেষণ করে কৃষিকাজ পরিচালনা করা দরকার। এতে একদিকে ফসলের অপচয় ও উৎপাদন খরচ কমবে, অন্যদিকে কৃষক সরাসরি আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

​প্রযুক্তির ছোঁয়া ও স্মার্ট কৃষি ​কৃষি আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার। বর্তমানে উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ড্রোন প্রযুক্তি, আইওটি (IoT) ভিত্তিক স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা, কৃষিবিষয়ক মোবাইল অ্যাপস, ডিজিটাল মাটি পরীক্ষা এবং আধুনিক কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এসব আধুনিক প্রযুক্তি কৃষকের সময়, অর্থ ও শ্রম বাঁচিয়ে উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যে বিরূপ প্রভাব আমাদের কৃষিতে পড়ছে, তা মোকাবিলায় এই আধুনিক ও সহনশীল প্রযুক্তিগুলো ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাজার ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত সহায়তা ​কৃষিতে এই আধুনিকায়নের সুফল প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের বিকল্প নেই। কৃষকদের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে কৃষিঋণ, উন্নত সার-বীজ সহায়তা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করতে হবে। তবে এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং কোল্ড স্টোরেজ বা উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন। প্রায়ই দেখা যায়, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে বাম্পার ফলন সত্ত্বেও সাধারণ কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই জায়গাটায় কঠোর তদারকি প্রয়োজন।

​তরুণদের অংশগ্রহণ ও গ্রামীণ অর্থনীতি ​আমাদের শিক্ষিত যুব সমাজকে কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলতেও এখন কার্যকর ও নান্দনিক উদ্যোগ প্রয়োজন। আধুনিক, স্মার্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিকে যদি একটি লাভজনক, সম্মানজনক এবং মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে দেশের বেকারত্ব যেমন বিপুল হারে কমবে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে। তরুণদের হাত ধরেই মূলত কৃষির এই আধুনিক রূপান্তর দ্রুত সম্পন্ন হতে পারে।

​বাস্তবতার দ্বারপ্রান্তে কৃষি বিপ্লব ​পরিশেষে বলা যায়, পরিকল্পিত চাষাবাদ ও কৃষির আধুনিকায়ন কেবল খাদ্য উৎপাদনই বৃদ্ধি করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। সঠিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তির টেকসই ব্যবহার এবং কৃষকবান্ধব নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে কৃষি বিপ্লবের যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর কেবল দূরবর্তী স্বপ্ন নয়—বরং সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবতার একদম দ্বারপ্রান্তে।

লেখক :কৃষিবিদ মনোয়ারুল ইসলাম, ডেপুটি রেজিস্টার, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়