আহনাফ তিহামী, তিতাস (কুমিল্লা)

  ২ ঘণ্টা আগে

ধর্মসাগরের তীরে রহস্যে ঘেরা ‘রানীর কুঠি’

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঐতিহাসিক ধর্মসাগরের উত্তর পাড়ে শতবর্ষের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে একটি রাজকীয় স্থাপনা, লোকমুখে যার পরিচিতি ‘রানীর কুঠি’। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী এই ভবনের সামনে ছবি তুলতে ভিড় করলেও এর নামকরণ, নির্মাণ ইতিহাস ও প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানেন খুব কম মানুষ। ত্রিপুরা রাজপরিবারের ইতিহাস, জনশ্রুতি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য মিলিয়ে জানা যায়, রানীর কুঠি ছিল তৎকালীন রাজপরিবারের অবকাশযাপনের একটি বিশেষ স্থাপনা। রাজকার্যের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা অবকাশ নিতে ত্রিপুরার রাজা ও রানীরা কুমিল্লায় এলে এই ভবনে অবস্থান করতেন। মূলত রানীদের অস্থায়ী আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণেই ভবনটি ধীরে ধীরে মানুষের মুখে ‘রানীর কুঠি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

তবে ভবনটির নির্মাণকাল ও নির্মাতা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত একটি তথ্যফলকে উল্লেখ রয়েছে, জনশ্রুতি অনুযায়ী রাজা ধর্মমাণিক্য এই ভবন নির্মাণ করেছিলেন। তবে ঐতিহাসিক সূত্রে ভবনটি মহারাজা উদয় মাণিক্যের নির্দেশে নির্মিত হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। কুমিল্লার ইতিহাসবিদদের মতে, এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাণসাল নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। ধর্মসাগরের উত্তর পাড়ঘেঁষা প্রায় ১ দশমিক ২৩ একর জমির ওপর প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ভবনটি আজও কুমিল্লার অন্যতম দর্শনীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। এর পূর্ব পাশে কুমিল্লা জিলা স্কুল ও স্টেডিয়াম এবং উত্তরে রয়েছে নগর উদ্যান ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়।

একসময় ত্রিপুরার রাজপরিবারের এই অবকাশকেন্দ্রে তৎকালীন ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আনন্দচন্দ্র রায়, কুমিল্লা টাউন হলের প্রতিষ্ঠাতা ধর্মমাণিক্য রায় বাহাদুর, ধর্মসাগর খননের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজা ধর্মনারায়ণ রায়সহ ত্রিপুরার বিভিন্ন জমিদার ও রাজপরিবারের সদস্যরা অবকাশযাপন করতেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। বর্তমানে রানীর কুঠি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)-এর তত্ত্বাবধানে ‘ড. আখতার হামিদ খান স্মারক বাসভবন’ নামে একটি সরকারি অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, জাতীয়ভাবে স্বীকৃত শিল্পী, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বিশেষ অতিথিদের অবস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। অতীতে বাংলাদেশের কয়েকজন রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিও এই ভবনে অবস্থান করেছেন।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ২০০৯ সালের ২২ এপ্রিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রত্নসম্পদ আইন, ১৯৬৮ অনুযায়ী রানীর কুঠিকে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ ঘোষণা করে। এরপরও ভবনটির পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ, নিয়মিত সংস্কার ও পর্যটক ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, রানীর কুঠি কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধর্মসাগরের শান্ত জলরাশি, শানবাঁধানো ঘাট, শতবর্ষী বৃক্ষ আর পাখির কোলাহলে ঘেরা রানীর কুঠি আজও কুমিল্লার ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। ইতিহাসবিদদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ, নিবিড় গবেষণা এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই রাজকীয় ভবনটিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দেওয়া সম্ভব।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়