আবদুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ
সুলতানা কামাল সেতু অরক্ষিত, জ্বলে না সোডিয়াম বাতি

নরায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর নির্মিত সুলতানা কামাল সেতুটি একেবারেই অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। সাত বছর ধরে সেতুর একটি সোডিয়াম বাতিও জ্বলে না। এতে রাতের আঁধারে চুরি-ছিনতাইসহ একের পর এক অপরাধ ও নানা দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। আর শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পাড়ে সেতুর নিচের জায়গা শুরু থেকেই অবৈধ দখলে চলে গেছে।
স্থানীয় প্রভাবশালীরা যার যার মতো করে বিভিন্ন দোকানপাট, ইট-বালুসহ কাঠ-বাঁশের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আর নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বর্তমানে চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
নিরাপত্তা-বেষ্টনীগুলো ভেঙে গেছে। এর মধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি বেষ্টনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। মাঝের ৩টি নিরাপত্তা-বেষ্টনী দেখলে মনে হবে স্তম্ভগুলোর বিভিন্ন অংশ প্রতিদিনই খসে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় সেতুটির পিলারগুলো একেবারেই নষ্ট হয়ে যাবে। সম্প্রতি একটিতে ফাটল ধরেছে। এ ঘটনায় নদীতে চলাচলকারী বড় পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে দায়ী করা হচ্ছে।
এদিকে সেতুর ওপরে থাকা কয়েকটি এক্সপানশন জয়েন্টের রাবার সম্পূর্ণ উঠে গেছে। এতে সংযোগস্থলগুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য এক্সপানশন জয়েন্টের বেশির ভাগ রাবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সেতুর ওপর দিয়ে মাঝারি ও বড় যানবাহন চলাচলের সময় বিকট শব্দ ও ঝাঁকুনি সৃষ্টি হয়। সেতুটির ফুটপাতের বেশ কিছু স্ল্যাব গায়েব হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে সুলতানা কামাল সেতুটি চালু হয়। বরাদ্দ অনুযায়ী ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে এ সেতুটি নির্মাণ করা হয়। একটি প্রজেক্টের আওতায় নির্মিত তিনটি সেতুর মধ্যে একটি হচ্ছে সুলতানা কামাল সেতু। সেতুটির মাধ্যমে ঢাকা ও রূপগঞ্জের সংযোগ হয়েছে বলে পরবর্তী সময়ে এটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পড়ে নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের ওপর। যানজট নিরসন করে ঢাকাকে একটি মেগাসিটিতে রূপান্তর করার কাজ এগিয়ে নিতে সরকার শীতলক্ষ্যা নদীতে এ সেতুটি নির্মাণ করেছে। ফলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ ঢাকার সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের অন্তত ৩০টি রুটের সরাসরি যোগাযোগ শুরু হয় এই সেতু হয়ে। ঢাকা মহানগরীকে পূর্বদিকে সম্প্রসারণের পথ এ সেতুটির মাধ্যমেই উন্মুক্ত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার যথাযথ হয়নি। ২০১৯ সালে একবার সেতুর বাতিগুলো আংশিক সংস্কার করা হলেও কিছুদিন পর সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি ইলেকট্রিক কেবলগুলো চুরি হয়ে যাওয়ায় অকেজো হয়ে পড়েছে সেতুর দুই পাশের বৈদ্যুতিক বাতি। তাই সন্ধ্যার পর এ সেতুতে চলাচল ঝুঁঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
পাশাপাশি এখানে চুরি ও ছিনতাইসহ নানা দুর্ঘটনা ঘটছে। অন্ধকার থাকায় মাঝেমধ্যেই গাড়ির চাপায় হতাহত হচ্ছে পথচারীরা।
অভিযোগ আছে, অন্ধকারাচ্ছন্ন এ সেতুটি কয়েক বছর আগে থেকেই অপহরণকারীরা নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। রাতের আঁধারে এ সেতুর ওপর থেকে কয়েকজন মোটরসাইকেল আরোহীকে অপহরণ করার ঘটনাও এর আগে ঘটেছে। রূপগঞ্জ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেমরা থানার সংযোগস্থল হওয়ার কারণে এ সেতুটি একটি অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এর ওপর সেতু কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালিপনা অপরাধীদের উৎসাহ জোগাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ডেমরা ও রূপগঞ্জের অংশে সুলতানা কামাল সেতুর নিচের ফাঁকা জায়গাগুলো এখনো দখলমুক্ত হয়নি। বরং ইট, বালু, পান-সিগারেট-চায়ের দোকানসহ কাঠ ও বাঁশের ব্যবসা শুরু করে সেতুটিকে এখন গিলে খাচ্ছে দখলদাররা। আর সেতু নির্মাণের শুরু থেকেই এ দখল বহাল থাকলেও কর্তৃপক্ষ যেন নির্বিকার।
তবে নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে, শিগগিরই সেতুর নিচের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে। এদিকে সেতুর নিচের মালামাল সরবরাহের কাজে অতিরিক্ত ট্রাক ও অন্যান্য ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করায় সেতুর নিচের রাস্তা ও পিলারগুলোর গোড়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া পিলারগুলোঘেঁষে বাস-ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন রাখা হয়।
সেতুর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের প্রকৌশলী শাহানা ফেরদৌস বলেন, এক্সপানশন জয়েন্ট রাবারের বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে। স্ল্যাবের ব্যাপারে বরাদ্দের পর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে কাজ চালানো হবে। তবে সোডিয়াম লাইটের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পর্যায়ক্রমে সেতুর অন্যান্য সমস্যা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান করা হবে।








































