ক্রীড়া ডেস্ক

  ১৭ ঘণ্টা আগে

‘লক্ষ্য এবার ইংল্যান্ড-বধ’

পতাকাটা উড়ছে, তিনি সেটাকে একবার এদিকে দোলাচ্ছেন, আবার ওদিকে। তার মাথার বাঁ পাশে চুলের ওপরও আঁকা প্রিয় দেশের পতাকা। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লিওনেল মেসিকে বললেন, ‘আমরা আর কোথায় যাব?’ এরপর সতীর্থদের বুকে জড়িয়ে নিলেন, গ্যালারির দিকে তাকিয়ে দেখলেন কীভাবে ৩-১ ব্যবধানের জয়টি লোকেরা উদযাপন করছে। গ্যালারি থেকে ভেসে আসছে- ‘আমি একজন আর্জেন্টাইন, এটা একটা আবেগ, যা আমি থামাতে পারি না’- আর সেইসঙ্গে তাল মিলিয়ে বাতাসে ঘুরছে জার্সিগুলো।

দলকে সাহায্য করার জন্য এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ঠিক যেমন- একটি ম্যাচ চাচ্ছিলেন, গত রবিবার সকালে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ছিল তেমনই এক পারফরম্যান্স। যার মাধ্যমে প্রমাণ করলেন যে দুই হাত দিয়ে দলকে বাঁচাতে তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত। এক অর্থে এটি ছিল তার নিজের একটি মধুর প্রতিশোধ। কারণ চোট পাওয়ার পর প্রায় এক মাস তাকে আলাদাভাবে অনুশীলন করতে হয়েছিল, নিতে হয়েছিল কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত (একজন বিশেষজ্ঞ তাকে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা করলে তিনি এই বিশ্বকাপেই খেলতে পারতেন না)। নিজের সেই চোটাক্রান্ত আঙুলটিকে এখনো একটি স্পিøন্ট দিয়ে সুরক্ষিত রাখতে হচ্ছে, যাতে নতুন কোনো সমস্যা না হয়।

চোট থেকে সেরে ওঠার জন্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার কাছে ছেড়ে দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন গোলকিপার। আর তার সেই ফাটকা একদম কাজে লেগে গেছে, তিনি বিশ্বকাপে খেলতে পারছেন। যদিও গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে ম্যাচে তেমন কোনো পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি তাকে। শেষ ৩২ ও শেষ ষেলোর নকআউটে অবশ্য গোল হজম করেছেন।

এতে কিছুটা খিটখিটে মেজাজ তৈরি হয়েছিল তার মনে। মনে হচ্ছিল তিনি দলকে সেভাবে সাহায্য করতে পারছেন না, যেমনটা তিনি আটলান্টায় মিশরের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ের পরও বলেছিলেন। তবে সেই মন্তব্যের রেশ টেনে এবার তিনি বলেন, ‘মিডিয়া আসলে আমার কথাগুলোকে একটু বেশিই বড় করে দেখিয়েছে।’

বিশ্বকাপজয়ী গোলকিপার আরো যোগ করেন, ‘আমি একজন গোলকিপার, তাই আমি গোল হজম করার চেয়ে বেশি বল সেভ করতে চাই, তবে ঠিক আছে...।’

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে এই গোলকিপারকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে খেলতে দেখা গেছে। ড্যান এনদোয়ের সেই শটটি তিনি নিজের বাঁ পা দিয়ে আটকাতে না পারলেও, পুরো ১২০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়ে মার্তিনেজ তার চেনা চন্দেই বেশ কিছু দুর্দান্ত সেভ করেছেন। দূর থেকে জাকার নেওয়া শটটি তিনি খুব সহজেই পজিশনে থেকে লুফে নেন।

এ ছাড়া এম্বোলোর সঙ্গে একটি ওয়ান-টু-ওয়ান বল ঠেকানো, পরবর্তীতে এম্বোলোর একটি হেড এবং এনদোয়ের মাটি ঘেঁষা আরেকটি কঠিন শট চমৎকারভাবে প্রতিহত করেন মার্তিনেজ।

নিজের পারফরম্যান্সের বার আরো উঁচুতে বেঁধে ২৩ নম্বর জার্সিধারী বলেন, ‘আমি দলকে অনেক সাহায্য করি, শুধু গোল সেভ করেই নয়; যখন পায়ে বল খেলে নিচ থেকে বিল্ডআপ করতে হয়। কিংবা প্রতিপক্ষের লং বলগুলো ক্লিয়ার করতে হয়, তখনো ভূমিকা রাখি। সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচটি খুব ভালো কেটেছে, আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি এবং সেমিফাইনালের জন্য নিজের পারফরম্যান্স আরো উন্নত করতে চাই।’

কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ফাইনালের পর তার চেনা সবুজ রঙের জার্সিতেই মার্তিনেজকে এদিন আবারও দেখা গেছে।

আসলে এমিলিয়ানো এদিন ছিলেন একদম নিজের চেনা রূপেই। ম্যাচের আগে অ্যারোহেড স্টেডিয়ামের চারপাশের গ্যালারিতে দর্শকদের যেমন অভিবাদন জানিয়েছেন। তেমনি ম্যাচের ভেতরেও তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে সুইজারল্যান্ড আক্রমণ করার চেষ্টা করছে এবং তাদের চেপে ধরার জন্য আর্জেন্টাইন সমর্থকদের গগনবিদারী আওয়াজ প্রয়োজন; ঠিক তখনই একটি দুর্দান্ত সেভের পর মার্তিনেজ দুই হাত তুলে দর্শকদের চিৎকার বাড়াতে বলেন, যেন গ্যালারির আওয়াজ ওয়ার্মআপের সময়ের মতোই ১০০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যায়।

মার্তিনেজ এখন আর্জেন্টিনার এক জনপ্রিয় চরিত্র। মেসির পর তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যার নামে গ্যালারিতে আলাদা গান গাওয়া হয়। গ্যালারি থেকে ভেসে আসা ‘দিবু, দিবু’ স্লোগান, যা এসে ছুঁয়ে যায় এই ৩৩ বছর বয়সি গোলকিপারকে। যিনি এবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ইংল্যান্ডের। যে দেশটির সঙ্গে এমিলিয়ানোর এক গভীর ও বিশেষ সংযোগ রয়েছে।

কারণ আর্জেন্টিনার মার দেল প্লাতায় জন্ম নেওয়া এই গোলকিপার মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০০৯ সালে আর্সেনালের হয়ে খেলার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এরপর অক্সফোর্ড ইউনাইটেড, শেফিল্ড ওয়েডনেসডে, উলভারহ্যাম্পটন এবং রিডিংয়ের হয়ে খেলার পর অ্যাস্টন ভিলায় থিতু হন, যেখানে তিনি এখন একজন আইকন ও জনপ্রিয় তারকা।

অবশ্য বার্মিংহামের ক্লাবটি এখনই তাকে মিস করার শঙ্কায় রয়েছে। কারণ ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসের সঙ্গে মার্তিনেজের দলবদলের আলোচনা চলছে। তবে এই গোলকিপার আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে নিজের ফোকাস সড়াতে চান না।

ইংল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে মার্তিনেজ জোর দিয়ে বলেন, ‘শ্রদ্ধা সবসময়ই থাকবে। আমার সন্তানরা ওখানে (ইংল্যান্ডে) জন্মেছে, গত ১৬ বছর ধরে আমি ইংল্যান্ডে বসবাস করছি। তাই এখন সময় কেবল এই ম্যাচটি উপভোগ করার এবং বাকি সব ম্যাচের মতোই জেতার চেষ্টা করার পালা।’

শেষে একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে উপহার হিসেবে একটি ছোট্ট স্মারক নেওয়ার পর মুখে চওড়া হাসি নিয়ে টানেলের দিকে হেঁটে যান মার্তিনেজ। সামনে আরো একটি রোমাঞ্চকর লড়াই উপভোগ করার জন্য তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত। সূত্র : ওলে স্পোর্টস, আর্জেন্টিনা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়