দিপংকর দাশ

  ২০ জুলাই, ২০১৯

রাজকন্যা ও রাক্ষুসী

পূর্ণিমায় চাঁদের আলোয় আলোকিত এক রাজ্যে বাস করে এক রাজকন্যা। অপূর্ব সেই রাজ্যের নাম ‘হিমাংশু নগর’। এই নগরের রাজকন্যা ছিল খুব সুন্দরী। চন্দনের মতো তার গাত্র বর্ণ, অমলিন তার হাসি। হাসলে মনে হয় চাঁদ তার ঠোঁটের কোণে বিরাজমান। রাজকুমারী সব সময় প্রাসাদের ভেতরে থাকে। রাজা তার কন্যাকে কখনোই অট্টালিকার বাহিরে যেতে দেন না। কিন্তু রাজকন্যার প্রবল ইচ্ছা সে বাহিরের জগৎটাকে দেখবে। কথা বলবে ফুল, ফল, পাখি, ঘাস আর লতাপাতার সঙ্গে। নিজেকে ওদের মাঝে বিলিয়ে দেবে।

কিন্তু অত্যন্ত কঠোর রক্ষুীদের চোখ এড়িয়ে সে কখনো বাহিরে যেতে পারে না। এক দিন সে তার সব সখীকে ডাকল তার কক্ষেু। সবার কাছে তার স্বপ্নের কথা জানায়। বিভিন্ন সখী বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু কোনো যুক্তিই সঠিক হচ্ছে না। সখীদের মধ্যে এক সখী ছিল খুব সুন্দরী। সে বলল, ‘ওহে রাজকন্যা। তুমি আমার পোশাক পরিধান করে বাহিরের জগৎ দেখে আসো আর আমি এখানে তোমার পোশাক পরিধান করে বসে থাকি।’ এই যুক্তিটা মন্দ নয়। রাজকন্যা রাজি হলো। পোশাক পরিবর্তন করে রাজকন্যা গেল বাহিরের অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করতে। অন্যান্য সখীর নিয়ে রাজকন্যা প্রথমে তাদের নিজস্ব বাগানে গেল ঘুরতে। আহা! কত সুন্দর এই বাগান। বিভিন্ন রকমের ফুলে ফুলে ভরা এই বাগানে রাজকন্যা প্রবেশ করায় ফুলেরাও যেন হাসছে। পাখিরা মিষ্টি সুরে গান গাইছে, মধুর বাতাস বইছে, ভ্রমররা গুঞ্জন করছে। রাজকন্যা পুলকিত হৃদয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগল সব। সে অত্যন্ত আনন্দ চিত্তে হাসতে লাগল। অট্টহাসিতে মুখরিত হয়ে গেল পুরো বাগান।

সেই বাগানে বাস করত এক রাক্ষুসী। সে ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু রাজকন্যার অট্টহাসিতে তার ঘুম ভেঙে গেল। সে জেগে উঠল। তার কাঁচা ঘুমে কে এসে ব্যাঘাত ঘটাল? মাথাটা পুরাই খারাপ হয়ে গেছে রাক্ষুসীর। সে বাহিরে এলো এবং রাজকন্যাকে দেখতে পেল। সে ভয়ংকর সুরে চিৎকার করতে লাগল। সখীরা পালিয়ে গেলেও রাজকন্যা পালাতে পারেনি। রাক্ষুসী রাজকন্যার ঘাড় মটকানোর জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু! কী জানি কী ভেবে রাক্ষুসী রাজকন্যাকে তার ডেরায় নিয়ে গেল। রাজকন্যা তখন অজ্ঞান হয়েছিল। জ্ঞান ফেরার পর সে খুব ভয় পেয়ে গেল। কাঁদতে লাগল।

ওদিকে যে সখী রাজকন্যার পোশাক পরিধান করেছিল সেও ভয় পাচ্ছে। কেন যে রাজকন্যা ফিরে আসছে না? বাকি সখীরা সব কথা খুলে বলার পর সে আরো ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু! কিছুই বলে না। চুপচাপ বসে থাকে। জঙ্গলে রাজকন্যা দুঃখে দিন কাটাচ্ছে। ডেরায় রাক্ষুসী বিচিত্র সব খাবার খেতে দেয় তাকে। কাঁচা মাছ, মাংস, প্রাণীর হাড় আরো কত কী! খাবে কী? গন্ধ শুঁকতেই সে বমি করে। ডেরার বাহিরেও যেতে পারে না। শুধুই কাঁদতে থাকে।

এদিকে রাজার বাড়িতে রাজকন্যার স্বয়ংবর অনুষ্ঠান। দূর-দূরান্ত থেকে বিরাট বিরাট প্রদেশের রাজকুমাররা এসেছে অনুষ্ঠানে। ভাদ্র মাস। তালনবমী তিথিতে হবে সেই মহানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের আগের দিন ‘মন্থ’ প্রদেশের এক সুন্দর রাজকুমার রাজার বাগানে তার বন্ধু ‘জুকো’কে নিয়ে ঘুরতে যায়। রাজকুমার ঘুরে ঘুরে বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করে। হঠাৎ তার কানে আসে এক মেয়ের কান্নার করুণ স্বর। সে এগিয়ে যায় স্বরের উৎস খুঁজে পাওয়ার আশায়। খুঁজতে খুঁজতে সে ডেরায় পৌঁছে যায়। গিয়ে দেখে এক অপুর্ব রমণী কান্না করছে। তার হাত পায়ে শিকল। রাজপুত্র শিকল খুলে দিয়ে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করে। রাজকন্যা সব খুলে বলে। রাজপুত্র তাই কন্যাকে নিয়ে ডেরা থেকে বাহিরে আসছে। ঠিক ওই সময় রাক্ষুসী হাজির। রাক্ষুসী ও রাজপুত্রের মধ্যে প্রবল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে রাক্ষুসী নিহত হয়। তারপর রাজপুত্র রাজকন্যাকে তার মহলে পৌঁছে দেয়। রাজকন্যাকে ফিরে পেয়ে সখী খুব খুশি হয়। দুজন দুজনার পোশাক পরিবর্তন করে। তাল নবমীতে শুরু হয় স্বয়ংবর অনুষ্ঠান। রাজকন্যা অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়ে আসে অনুষ্ঠানে। এদিকে সব রাজপুত্র তাদের আসনে বসে আছে। একে একে তারা তাদের পরাক্রম দেখাচ্ছে। সবার পরাক্রমে মুগ্ধ রাজমহল। এবার রাজকন্যা মালা পরাবে তার প্রিয় রাজপুত্রের গলায়। খুঁজতে খুঁজতে রাজকন্যা পেয়ে যায় সেই রাজপুত্রকে; যার কারণে সে বেঁচে ফিরেছে রাক্ষুসীর হাত থকে। সঙ্গে সঙ্গে সে ওই রাজপুত্রের গলায় পরিয়ে দিল ফুলের মালা। বিয়ে হলো দুজনের। বধূসহ নিজ রাজ্যে ফিরে গেল রাজপুত্র। দুজনেই আনন্দে বাস করতে থেকে রাজমহলে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়