আব্দুস সালাম

  ৮ ঘণ্টা আগে

বাজপাখির গল্প

রাত হয়ে গেছে। আকাশে টিমটিম করে তারা জ্বলছে। ছোট্ট নাজিফা বিছানায় শুয়ে দাদার হাত ধরে বলল, দাদা, আজ আমাকে একটা পাখির গল্প শোনাও না!

দাদা হেসে বললেন, কোন পাখির গল্প শুনতে চাও?

নাজিফা একটু ভেবে বলল, আজ আমি বাজপাখির গল্প শুনব।

দাদা চশমাটা ঠিক করে গল্প শুরু করলেন।

অনেক দূরের এক পাহাড়ে এক জোড়া বাজপাখি বাস করত। তারা ছিল খুব সাহসী ও পরিশ্রমী। বসন্তকালে মা বাজপাখি কয়েকটি ডিম পাড়ল। বাবা ও মা দুজনেই পালা করে ডিমগুলোর যত্ন নিতে লাগল।

একদিন ডিম ফুটে বের হলো ছোট্ট একটি ছানা। তার নাম রাখা হলো ঝলক।

ঝলক ছিল খুবই দুর্বল। সে নিজে হাঁটতেও পারত না। বাবা বাজপাখি শিকার ধরে আনত আর মা বাজপাখি সেই খাবার ছোট ছোট করে ছিঁড়ে তাকে খাওয়াত।

কয়েকদিন পর ঝলক ভাবল,

- আহা! কী মজা! মা-বাবা সব সময় আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু বাজপাখির জীবন অন্য পাখিদের মতো নয়।

একদিন মা খাবারের টুকরোটি ঝলকের মুখে না দিয়ে একটু দূরে রেখে দিল।

ঝলক অবাক হয়ে বলল, মা, খাবারটা এখানে কেন?

মা মুচকি হেসে বলল, তুমি নিজেই নিয়ে খাও।

ঝলক চেষ্টা করল, কিন্তু পড়ে গেল। আবার চেষ্টা করল। আবার ব্যর্থ হলো।

তখন সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি পারব না!

বাবা বললেন, যে চেষ্টা করে, সে একদিন অবশ্যই পারে।

ঝলক আবার চেষ্টা করল। অনেক কষ্টে খাবারের কাছে পৌঁছাল। তারপর ঠোঁট দিয়ে খাবার তুলতে শিখল।

দাদা বললেন, দেখো নাজিফা, জীবনে প্রথম সাফল্য আসে চেষ্টা থেকে। নাজিফা মাথা নেড়ে বলল, ঠিক বলেছ দাদা।

এরপর এলো আরো কঠিন সময়।

একদিন মা বাজপাখি ঝলককে নিয়ে উঁচু আকাশে উড়ল। তারপর হঠাৎ তাকে ছেড়ে দিল! ঝলক ভয়ে চিৎকার করে উঠল, মা! আমি পড়ে যাচ্ছি! সে প্রাণপণে ডানা ঝাপটাতে লাগল। মাটিতে পড়ার আগেই মা তাকে ধরে ফেলল।

পরের দিন আবার একই ঘটনা ঘটল। ঝলক রাগ করে বলল, মা, তুমি আমাকে এত কষ্ট দাও কেন? মা স্নেহভরা কণ্ঠে বলল, আজকের কষ্টই তোমার আগামী দিনের শক্তি। দিনের পর দিন অনুশীলনের পর একদিন ঝলক সত্যিই উড়তে শিখে গেল। সে মেঘের উপর দিয়ে উড়ল, পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়ে গেল। আনন্দে সে চিৎকার করে বলল, আমি পেরেছি! আমি পেরেছি!

বাবা-মা গর্বে হাসলেন।

সময় গড়িয়ে গেল। ঝলক বড় হয়ে শক্তিশালী বাজপাখি হলো। সে নিজের পরিবার গড়ল এবং ছানাদেরও একইভাবে সাহসী হতে শেখাল।

বছর কেটে গেল।

একসময় ঝলকের বয়স চল্লিশ হলো। তখন তার ঠোঁট ভোঁতা হয়ে গেল, নখ ভারী হয়ে গেল, আর পালকগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এভাবে চললে আর শিকার ধরতে পারবে না। তখন তার সামনে তিনটি পথ ছিল- হাল ছেড়ে দেওয়া, অন্যের ওপর নির্ভর করা, অথবা নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা। ঝলক তৃতীয় পথটি বেছে নিল। সে এক নির্জন পাহাড়ে চলে গেল। সেখানে সে ধীরে ধীরে পুরোনো পালক ঝরিয়ে ফেলল। পাথরের সঙ্গে ঘষে ভোঁতা ঠোঁট ভেঙে ফেলল। নতুন ঠোঁট ও নখ গজানোর জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করল। সেই সময় তার অনেক কষ্ট হয়েছে। কিন্তু সে হাল ছাড়েনি।

প্রায় পাঁচ মাস পর নতুন পালক, নতুন ঠোঁট আর নতুন নখ নিয়ে সে আবার আকাশে উড়ল। মনে হলো যেন তার নতুন জন্ম হয়েছে।

দাদা গল্প শেষ করে বললেন, বলো তো নাজিফা, এই গল্প থেকে কী শিখলে?

নাজিফা হাসতে হাসতে বলল, কষ্টকে ভয় পেলে বড় হওয়া যায় না। চেষ্টা করলে অসম্ভবও সম্ভব হয়। আর জীবনে সমস্যা এলে হাল ছেড়ে দেওয়া নয়, নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে হয়।

দাদা খুশি হয়ে বললেন, একদম ঠিক। বাজপাখির মতো সাহসী, পরিশ্রমী আর ধৈর্যশীল হলে জীবনের আকাশও একদিন জয় করা যায়। নাজিফা মুচকি হেসে দাদার বুকে মাথা রাখল। কিছুক্ষণ পরই সে স্বপ্নের দেশে উড়ে গেল- ঠিক এক সাহসী বাজপাখির মতো।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়