জহিরুল ইসলাম
রঙের রাজ্যে তিতলি

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই তিতলির খুব ভালো লাগছিল। আকাশটা আজ যেন একটু বেশিই নীল, আর বাতাসে দারুণ ফুলের ঘ্রাণ। সে ঠিক করল আজ বাগানের ভেতর গিয়ে প্রজাপতিদের সাথে একটু লুকোচুরি খেলবে।
তিতলি যেদিকে পা বাড়ায়, পাখিরা গান গাইতে গাইতে ওর জন্য পথ ছেড়ে দেয়।
বনের ভেতর ঢুকতেই এক জায়গায় তিতলি দেখল একটা রঙের দঙ্গল! যেন রঙের উৎসব চলছে। লাল রঙের জবাফুল, হলুদ রঙের সোনালু, নীল রঙের অপরাজিতা আর সাদা রঙের গন্ধরাজ-সবাই মিলে যেন রঙের রাজ্য বানিয়ে রেখেছে।
তিতলি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
‘আহা! কেন যে সব ফুল এক রঙের হয় না!’ তিতলির মুখ থেকে কথাটা আপনা আপনি বেরিয়ে এলো।
এ কথা শুনে পাশে থাকা একটা বড় লাল রঙের গোলাপ হাসতে হাসতে বলল, ‘তিতলিমণি! আমরা সবাই যদি একই রঙের হতাম, তাহলে কি এই বাগান দেখতে এত সুন্দর লাগত?’
তিতলি মাথা চুলকালো।
‘হুম। সত্যিই তো! কিন্তু তোমাদের এত এত রঙ আসে কোথা থেকে?’
গোলাপ ফুলটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঝপ করে নেমে এলো রঙপরি! তার পোশাকে হাজার রঙের ঝিলিক, চুলে রঙিন ফিতে, চোখে যেন রঙধনুর সাতরঙ।
‘রঙের গল্প জানতে চাও?’ পরিটি হেসে বলল।
তিতলির চোখ তখন বড় বড়-‘হ্যাঁ! খুউব জানতে চাই।’
রঙপরি হাত নেড়ে বলল, ‘তাহলে এসো, তোমাকে নিয়ে যাই আমাদের রঙভূমিতে।’
এক মুহূর্তেই তিতলি নিজেকে দেখতে পেল এমন এক দেশে-যেখানে সবকিছুর ভেতরই রঙের ঢেউ। সেখানে বাতাসে রঙের গন্ধ, মাটিতে রঙের আলপনা আর আকাশে উড়ছে রঙিন পাখি।
রঙপরি বলল, ‘এখানে রঙেরা থাকে। তারা ঠিক করে কোন জিনিস কোন রঙ পাবে।’
তিতলি দেখল ছোট ছোট নীল রঙেরা দড়ি ধরে আকাশে উড়ছে-তারা আকাশকে নীল রঙ দিয়ে সাজাচ্ছে। লাল রঙের দল ফুলের পাপড়িতে রঙ ছিটাচ্ছে। হলুদ রঙেরা সূর্যের কাছ থেকে আলো নিয়ে ফুলের মুকুট বানাচ্ছে।
তিতলি ঘুরে ঘুরে তাদের কাজ দেখতে লাগল।
তখনই এক গোলাপি রঙ এসে বলল, ‘তিতলি, কোনো রঙই একা সুন্দর নয়। আমরা সবাই মিলে পৃথিবীকে রঙিন করে তুলি। তাই তো পৃথিবী এত সুন্দর।’
তিতলি হাসল।
‘তাই তো! যদি সব ফুল একই রঙের হতো, তাহলে বাগানে ঘুরতেই ভালো লাগত না।’
রঙপরি মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ। আর একটা কথা-রঙ আসলে আলো থেকেই জন্ম নেয়। আলোর ভেতর অনেক রঙ লুকানো থাকে। কোনো জিনিস থেকে আলো কোন রঙ ফেরত পাঠায় তার ওপর নির্ভর করে আমরা কী রঙে তাকে দেখি।’
তিতলি কিছুটা বুঝল, কিছুটা বুঝল না। সে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই বেউউউ করে বাতাস বয়ে এলো।
রঙপরি বলল, ‘চলো, তোমাকে আবার তোমার বাগানে নামিয়ে দিই।’
একপলকে তিতলি ফিরে এলো সেই বাগানে। কিন্তু এবার বনটা যেন আরো বেশি রঙিন!
যে ফুলগুলোকে সে প্রতিদিন দেখত, আজ তাদের রঙগুলো যেন রহস্যময়, নতুন।
তিতলি হাসতে হাসতে লাল গোলাপের কাছে গিয়ে বলল, ‘জানো? রঙেরা মিলে তোমাদের সাজায়। তোমাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা রঙ যেন একেকটা গল্প।’
ফুলটা চোখ টিপে বলল, ‘তাই নাকি! তুমি তো আমাদের গল্পের পরি হয়ে গেছ!’
তিতলি হেসে লাফাতে লাফাতে বাড়ি ফিরে গেল। মনে মনে সে শুধু একটা কথাই ভাবছে-রঙের বৈচিত্র্যই পৃথিবীকে এতটা সুন্দর করে তোলে।
"






































