জি সেভেন সম্মেলন
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এগোতে চায় মিত্ররা

ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁ শহরে বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি সেভেন সম্মেলন এমন এক সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্সে পৌঁছানোর আগে থেকেই মিত্রদেশগুলোর নেতাদের মধ্যে তাকে ‘না’ বলার প্রবল এক মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
বছরের পর বছর শুল্কের হুমকি, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং প্রকাশ্য বাদানুবাদের পর, অনেক বিশ্বনেতাই এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো সাময়িক প্রতিবন্ধকতা নন, বরং এটিই এখন মার্কিন নীতির স্থায়ী চরিত্র।
ওভাল অফিসে কে বসলেন তা এখন আর বড় বিষয় নয়, এই পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হতে চলেছে। আর তাই, বিশ্বনেতারা কেবল ট্রাম্পকে তোষামোদ করার নীতি বাদ দিয়ে এমন এক ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদার থাকবে না এবং ইউরোপও আমেরিকার সিদ্ধান্ত চোখ বন্ধ করে মেনে নেবে না।
জি সেভেনে ইরান সংকটের ছায়া: সোমবার থেকে শুরু হওয়া জি সেভেন সম্মেলনে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনৈতিক অভিঘাতের স্পষ্ট ছায়া রয়েছে। যদিও ট্রাম্প গত রোববার যুদ্ধ অবসানে চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন, তবুও এই যুদ্ধ ইতোমধ্যেই বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে এবং নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ফ্রান্সে আয়োজিত সম্মেলনে গেছেন এটি প্রমাণ করতে যে, তার কৌশল কার্যকর হয়েছে। কূটনীতি, বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নিরাপত্তা এবং চীনের ক্ষেত্রে মিত্রদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন; সম্মেলনে সমবেত হওয়া অনেক নেতাই যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রতিরোধে এবার তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন কেন্দ্র’-এর ইউরোপ, রাশিয়া এবং ইউরেশিয়া কর্মসূচির পরিচালক ম্যাক্স বার্গম্যান বলেন, ইউরোপ এখন কয়েক বছর আগের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রতিটি দাবি মুখ বুঁজে মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক সীমা এখন শেষ হয়ে গেছে।
ইউরোপের স্বনির্ভরতার প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্র এখনও পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোর অপরিহার্য শক্তি, যা পারমাণবিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং নেটো জোটের প্রধান লজিস্টিক সরবরাহ করে।
তবুও ইউরোপের অনেক নেতাই এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সংকটে নেতৃত্ব দিতে না চায় বা না দেয়, তাহলে বিশ্বের রূপ কী হবে?
ইরান সংকট নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজধানীতে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া সিদ্ধান্তের মাশুল গুণতে হচ্ছে তাদের।
গ্রিনল্যান্ড দখল বিতর্ক ও নেটো জোটে ফাটল: এই সপ্তাহে ট্রাম্পের নির্ধারিত চারটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের তিনটিই হবে পশ্চিম এশিয়ার নেতাদের সঙ্গে। বিশ্বনেতারা ইরান যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান চাইলেও এর প্রভাব এখনও রয়ে গেছে।
তাছাড়া, বিদেশে ট্রাম্পের কম জনপ্রিয়তার কারণে তার সঙ্গে যে কোনো করমর্দন, ছবি তোলা বা প্রকাশ্য আলিঙ্গন এখন মিত্র দেশগুলোর নেতাদের জন্য বড় ধরনের অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে ইউরোপীয় নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রস্তুতি নিলেও, ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কোনও প্রকাশ্য সংঘাতে জড়াতে চান না। তাই জি সেভেন সম্মেলনের আয়োজকরা এবার যে কোনও কূটনৈতিক জটিলতা এড়াতে সতর্ক পদক্ষেপ নিয়েছেন।
ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন উদযাপনের জন্য সম্মেলনের সময়সূচি একদিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, হোয়াইট হাউজে যে অনুষ্ঠানটির নাম দেওয়া হয়েছিল “ইউএফসি ফ্রিডম ২৫০”।
এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, যিনি গত বছর ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে এক উত্তপ্ত বৈঠকে জড়িয়েছিলেন, তাকে এবার আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। অন্যদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ ট্রাম্পকে খুশি করতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে বিখ্যাত ভার্সাই প্রাসাদে এক রাজকীয় ব্যক্তিগত নৈশভোজের আয়োজন করেন।
তবুও বিশ্বনেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে ট্রাম্পের কোন রূপটি নেমে আসে তা আগে থেকে আঁচ করা। ট্রাম্প যেমন উষ্ণ ব্যক্তিগত কূটনীতি ও চুক্তি করতে পারেন, তেমনই মিত্রদের সঙ্গে প্রকাশ্য বাদানুবাদ, হঠাৎ নীতি পরিবর্তন এবং যত্ন সহকারে তৈরি করা ঐকমত্য থেকে এক নিমেষে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যও তিনি পরিচিত।
ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি মেজাজ সামলানোর বিদ্যায় গত এক দশকে বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন এবং গত বছরের বৈঠকগুলো ভালোভাবেই পার করেছিলেন। কিন্তু চলতি বছর সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনমার্কের কাছ থেকে বরফে ঢাকা দ্বীপাঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে মরিয়া চেষ্টা শুরু করেন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কোনো কোনো ইউরোপীয় নেতা আশঙ্কা করেছিলেন ট্রাম্প হয়ত ওই দ্বীপে মার্কিন সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে বসবেন। এমন পদক্ষেপ নিলে তা যুক্তরাষ্ট্রকে নেটোর প্রধান সামরিক রক্ষকের পরিবর্তে নেটোর জন্য প্রধান সামরিক হুমকিতে পরিণত করত।
এই গ্রিনল্যান্ড কেলেঙ্কারি ইউরোপজুড়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে তলানিতে নামিয়ে এনেছে। এমনকি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং তার স্ত্রী উষা ভ্যান্স যখন গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক স্পেস বেস পরিদর্শনে যান, তখন থেকেই ইউরোপের উদ্বেগ আরও বাড়ে।
বিশ্লেষক ম্যাক্স বার্গম্যানের মতে, "ইতিহাসবিদরা গ্রিনল্যান্ড বিতর্ককে সেই মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত করবেন, যখন ট্রান্সআটলান্টিক জোটের ভাঙন সত্যিই শুরু হয়েছিল।" ইউরোপীয় নেতারা এখন নিজেদের প্রশ্ন করছেন, ট্রাম্পের সামনে নতজানু হয়ে আসলে তাদের লাভ কী?
ইউরোপীয় স্বায়ত্তশাসনের লড়াইয়ে ম্যাক্রোঁ: ইউরোপের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো সওয়াল করছেন সম্মেলনের আয়োজক দেশ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। বছরের পর বছর ধরে তিনি ইউরোপকে সামরিক ও কৌশলগতভাবে স্বাধীন হওয়ার তাগাদা দিচ্ছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের সঙ্গে ইউরোপের অগ্রাধিকার না মিললেও তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে এবং প্রভাব ধরে রাখতে পারে।
নিজের প্রেসিডেন্সির শেষ বছরে এসেও ম্যাক্রোঁ এই ধারণার পক্ষে লড়ছেন, যদিও কিছু ইউরোপীয় দেশ এখনও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছত্রছায়াই বেশি পছন্দ করে। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের জন্য চাপ দেওয়া বজায় রাখবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে নেতৃত্ব দিতে পারে না। ইউরোপের অনেক দেশেরই প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় বোঝা ভাগ করে নেওয়ার অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে।"
এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনায় আরও বেশি সোচ্চার হয়েছেন।
গত এপ্রিলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে তিনি সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, "আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে এটি এমন এক অনন্য মুহূর্ত যেখানে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, একজন রুশ প্রেসিডেন্ট এবং একজন চীনা প্রেসিডেন্ট, সবাই ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাই আমাদের জেগে ওঠার এটিই সঠিক সময়। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ইউরোপীয় হিসেবে আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।"
তবে মাক্রোঁর এই স্বাধীন চেতনার মানে ট্রাম্পকে পুরোপুরি পরিহার করা বা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা নয়। তিনি প্রায়ই ট্রাম্পের অহংবোধকে খুশি করতে নানা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করেন, যেমন আইফেল টাওয়ারে আতিথেয়তা, বাস্তিল দিবসের সামরিক প্যারেডে ট্রাম্পকে ফ্রন্ট-রো সিট দেওয়া কিংবা নটরডেম ক্যাথেড্রালের পুনরুত্থান অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানো।
কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ ইউরোপের রাজনীতিবিদদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট থেকে দূরত্ব বজায় রাখার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ইউরোপীয় মিত্রদের অস্বস্তি: ট্রাম্পের কিছু ঘনিষ্ঠ মিত্রর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। তিনিও এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। গ্রিনল্যান্ড সংকট ও ইরান যুদ্ধবিধ্বস্ত বৈশ্বিক অর্থনীতির কারণে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাজনৈতিকভাবে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম জি সেভেন সম্মেলনে যোগ দেওয়া সানায়ে তাকাইচি অবশ্য ট্রাম্প এবং মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সাথে জাপানের সুসম্পর্ক ব্যবহার করে এই উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা নিতে আগ্রহী।
তবে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে আছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। নিজ দেশে নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার সংকটে থাকা স্টারমার ইরানে মার্কিন হামলায় যোগ না দেওয়ায় ট্রাম্পের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছেন।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে স্টারমারকে ‘কাপুরুষ’ বলে উপহাস করেছেন, ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরীগুলো নিয়ে ঠাট্টা করেছেন এবং যুক্তরাজ্যকে ‘অসহযোগিতাপূর্ণ দেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অবজ্ঞা যুক্তরাজ্যে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ‘বিশেষ সম্পর্ক’কে তিক্ত করে তুলেছে, যা ব্রেক্সিটের এক দশক পর স্টারমার সরকারকে আবার ইউরোপের কাছাকাছি নিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাজ্য ধীরে ধীরে ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের দিকে ঝুঁকছে।









































