reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের শান্তি আলোচনা যেভাবে এগোল  

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার শেষ পর্যায়ে এমন কিছু মুহূর্ত এসেছিল, যখন মনে হচ্ছিল সব প্রচেষ্টা ভেস্তে যাবে। তবে প্রতিবারই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আলোচনাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, ‘এই পুরোটা সময় তিনি (আসিম মুনির) দিন-রাত জেগে ছিলেন। যুদ্ধের আগুন নেভাতে সেনাপ্রধান দিন-রাত আত্মত্যাগ করেছেন। আলোচনার মাঝপথে অনেকবার মনে হয়েছিল সব কিছু থেমে যাবে। কিন্তু সেনাপ্রধান হাল ছাড়েননি। যদি এই চেষ্টা অব্যাহত না থাকত তাহলে শান্তির স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যেত।’

লোকচক্ষুর আড়ালে পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটি প্রায় তিন মাস ধরে চলেছে। দীর্ঘ এই যুদ্ধের ফলে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার। এমন পরিস্থিতিতে সমঝোতা চুক্তির ‘অসম্ভব’ কাজটি সফলভাবে শেষ করল পাকিস্তান।

একইসঙ্গে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির ‘ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টার’ প্রশংসা করেছেন শেহবাজ শরিফ। এছাড়া মধ্যস্থতায় বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য তিনি কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং চীনে প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

চুক্তির বিস্তারিত তথ্য জানতে আলজাজিরা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

গত সোমবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ প্রথম এই ঐতিহাসিক চুক্তির ঘোষণা দেন। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করা। তার ঘোষণার কিছুক্ষণ পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এক পোস্টে তিনি ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। পাকিস্তানের আয়োজনে আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।

ইরানের আধা-সামরিক বার্তা সংস্থা মেহের নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ দফার ওই সমঝোতা স্মারকের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। একই সঙ্গে ইরানের কাছাকাছি মোতায়েন করা বাহিনীও সরিয়ে নেবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ ছিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এখন থেকে এটি আবার স্বাভাবিক যাতায়াতের জন্য খুলে দেওয়া হবে।

চুক্তির অর্থনৈতিক দিকটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদ আগামী ৬০ দিনে ধাপে ধাপে মুক্তি দেওয়া হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে দুই দেশ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী দফার আলোচনা চালিয়ে যাবে।

তবে মেহের নিউজ জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের মতো বিষয়গুলো আপাতত আলোচনার এজেন্ডা থেকে বাদ রাখা হয়েছে।

এই ঐতিহাসিক সমঝোতাটি হয়েছে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অধীনে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা এ দায়িত্ব নেন।

সোমবার শেহবাজ শরিফ মোজতবা খামেনির প্রশংসা করে বলেন, চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও মোজতবা খামেনি অসীম প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন।

হার না মানার কূটনীতি: এই শান্তি চুক্তির পথ মোটেও সহজ বা সোজা ছিল না। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল প্রথম যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার জন্য একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন।

সেই সময় শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্র কর্মকর্তাদের একের পর এক ফোন করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। তার হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, শেহবাজ শরিফ ও আসিম মুনিরের ‘ব্যক্তিগত অনুরোধে’ ট্রাম্প পরে এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন।

ইসলামাবাদে বৈঠক ও অচলাবস্থা: ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজন করে পাকিস্তান। ১৯৭৯ সালের পর এটিই ছিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপস্থিত ছিলেন। তবে কোনো চুক্তি ছাড়া সেই বৈঠক শেষ হয়।

এরপর কয়েক সপ্তাহ আর কোনো সরাসরি বৈঠক হয়নি। এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে দুই পক্ষ ফোনে কথা বলতে পারে। এই সময়ে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দফায় দফায় যাতায়াত করেন। তবে প্রকাশ্যে অগ্রগতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না।

আস্থার সংকট দূর করা: সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক জওহর সেলিম বলেন, ইসলামাবাদের এই মধ্যস্থতা আসলে কূটনীতিতে ‘কখনো হার না মানার’ এক অনন্য উদাহরণ। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে কী বদলেছে তা বড় কথা নয়। বরং দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সৎ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট দূর করতে পেরেছে।

সেলিমের মতে, পাকিস্তানের কাজ শুধু দুই দেশের দূরত্ব কমানো ছিল না। বরং দেশ দুটির ভেতরে থাকা কট্টরপন্থী ও উদারপন্থীদের মতভেদের মধ্যেও সেতুবন্ধন করতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, একটি বিশ্বস্ত বন্ধু ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের যে ভাবমূর্তি, সেটি ছিল দেশটির প্রধান শক্তি।

চীনের ভূমিকা ও শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপ: শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান একা কাজ করেনি। গত ৩১ মার্চ চীন ও পাকিস্তান মিলে পাঁচ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা সই করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় চীনের জ্বালানি আমদানিতে বড় সমস্যা হচ্ছিল। মূলত এই উদ্বেগ থেকে বেইজিং শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। গত মে মাসে সেনাপ্রধান আসিম মুনির দ্বিতীয়বারের মতো তেহরান সফর করেন। তার সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও কয়েকবার ইসলামাবাদ সফর করেন। তিনি শেহবাজ শরিফ ও আসিম মুনিরের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেন। একটি সফরের সময় আরাঘচি বলেছিলেন, কোনো একটি ফলাফল না আসা পর্যন্ত তেহরান পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে চায়।

শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা: অবশেষে শনিবার নাগাদ আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার ওই দিন সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা একে আলোচনার ‘শেষ ধাপ’ বলে বর্ণনা করেন।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ এই পুরো প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ‘ধৈর্যশীল ও নিরবচ্ছিন্ন’ প্রচেষ্টার বিশেষ প্রশংসা করেন। ওই দিন শেহবাজ শরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে।

খবর আল জাজিরার।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়