নিজস্ব প্রতিবেদক
শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড
৩১ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে ৩১ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও ১০ জনকে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই সমাবেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে ‘জেনোসাইড’ (গণহত্যা) হিসেবে উল্লেখ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল শেখ হাসিনাসহ ৩১ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পর নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলামকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকারের পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ মিলে একটি নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। তবে ঘটনার পর এ নিয়ে করা মামলাটির কোনো তদন্তকাজ চালানো হয়নি। বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও এ হত্যাকাণ্ডের কোনো তদন্ত বা বিচার পায়নি হেফাজতে ইসলাম। অবশেষে এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমি ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বভার নেওয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছি। দ্রুত তদন্ত শেষ করে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেননা শিশুসহ আলেমণ্ডওলেমাকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। এটি জেনোসাইড তথা গণহত্যা ছিল। দেশের ইতিহাসে এমন বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড কখনো ঘটেছে বলে জানা নেই। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি এ মামলায় আনা দুটি অভিযোগ তুলে ধরেন। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে ঢাকায় ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা আনা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে আনা হয়েছে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনা। শাপলা চত্বরে নারকীয় এ ঘটনাকে গণহত্যা আখ্যায়িত করে চিফ প্রসিকিউটর জানান, ঘটনাটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ছিল। সরকারের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এমনকি শাপলা চত্বরে গ্রেনেড, মারণাস্ত্র ব্যবহারের জন্য মন্ত্রী-প্রশাসনের একটি বৈঠকও হয়েছিল। এরই পরিপ্রেেিত শিশুসহ হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়। ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে আনা দুটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হোক। শুনানি শেষে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেপ্তারদের আগামী ১৬ আগস্ট হাজিরের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, জহিরুল আমিন, তারেক আবদুল্লাহ, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যরা।
শেখ হাসিনা ছাড়া অপর আসামিরা হলেন- তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রুপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দণি) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এস এম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ওসি বি এম ফরমান আলী।
বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন ডা. দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, জিয়াউল আহসান, এ কে এম শহীদুল হক, শাহরিয়ার কবির, আবদুল জলিল মণ্ডল, ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু। অন্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন হাসানুল হক ইনু। এছাড়া আবদুর রাজ্জাকও গ্রেপ্তার আছেন। বাকিরা পলাতক। এদিন বেলা পৌনে ১১টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন।
"







































