মো. জাহিদুল ইসলাম

  ৫ ঘণ্টা আগে

বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২৬ : স্পেন-ফ্রান্স

ফাইনালে ওঠার থ্রিলার

বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে যখন ফ্রান্স-স্পেন মুখোমুখি হয়, তখন ফুটবল বিশ্বের চোখ থমকে দাঁড়ায় এক চিরন্তন দ্বৈরথে। একদিকে ফরাসিদের জমাট রক্ষণ আর ক্ষিপ্র গতির প্রতি-আক্রমণ; অন্যদিকে স্প্যানিশদের শৈল্পিক পাসিং ফুটবল ‘টিকিটাকা’র আধুনিক রূপ। মাঠের এ লড়াই শুধু দুটি দলের নয়, বরং ইউরোপীয় ফুটবলের দুই ভিন্ন দর্শনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। আজ মঙ্গলবার রাত ১টায় এ হাইভোল্টেজ ম্যাচ সামনে রেখে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন টানটান উত্তেজনা। কেউ কেউ ‘ফাইনালের আগেই ফাইনাল’ বলে অভিহিত করছেন। একদিকে যেমন রয়েছে ফরাসি তারকাদের একক নৈপুণ্যে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে স্পেনের দলীয় বোঝাপড়া আর মাঝমাঠের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ। সবুজ গালিচায় কে হাসবে শেষ হাসি, দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা।

নীল জার্সিধারী ফ্রান্স অনায়াসে শেষ চারে উঠেছে। তাদের অলস্টার আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি ৬ ম্যাচে এরই মধ্যে ৮ গোল করেছেন। এমবাপ্পের পাশে রয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখ তারকা মাইকেল ওলিসে, ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমানে ডেম্বেলে এবং প্যারিস সেন্ট জার্মেইর জুটি ব্র্যাডলি বারকোলা ও ডিসায়ার ডুয়ে।

অন্যদিকে লাল জার্সিধারী স্পেন লুইস ডি লা ফুয়েন্তের অধীনে নিজেদের পরিচিত বল দখলের পারদর্শিতা, সুযোগ বুঝে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে কৌশলী আক্রমণ চালানো ও দুর্দান্ত প্রতিভাবান স্কোয়াড নিয়ে ঠাণ্ডামাথায় সেমিফাইনালে উঠে এসেছে। ফ্রান্স যেখানে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঝলকে এগিয়েছে, সেখানে স্পেন নির্ভর করেছে দলগত শক্তির ওপর। রদ্রি, পেদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের নিখুঁত পাসিংয়ের ওপর গড়ে ওঠা তাদের সুসংগঠিত মিডফিল্ড টিনএজার উইঙ্গার লামিন ইয়ামালের জন্য নিয়মিত সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। ফলে এটি হতে যাচ্ছে দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এক ক্লাসিক লড়াই।

স্পেন বলের দখল ধরে রেখে এমবাপ্পে ও তার সতীর্থদের কাছে বল পৌঁছানোর পথ বন্ধ করার চেষ্টা করবে। একইসঙ্গে তারা চাপ সৃষ্টি করতে চাইবে ফ্রান্সের রক্ষণভাগের ওপর, যাদের এখন পর্যন্ত এ টুর্নামেন্টে খুব বেশি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়নি। যদিও কাজটি সহজ হবে না, তবু সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে নিজেদের রেকর্ড থেকে আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে স্পেন। গত বছর উয়েফা নেশন্স লিগের রোমাঞ্চকর ম্যাচে স্পেন ৫-৪ গোলে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল। এর আগে ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালেও ২-১ ব্যবধানে জিতে পরে শিরোপা জয় করে তারা। গত শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলসে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ের পর ইয়ামাল বলেন, স্পেনের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা দুটি দুর্দান্ত দল, বিশ্বের সেরাদের মধ্যে। কী হবে, সেটা দেখা যাবে। কিন্তু আমাদের কোনো ভয় নেই। দুটি সম্ভাবনা আছে- হয় তারা টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠবে, নয়তো আমরা তাদের টানা তিনবার হারাব। দেখা যাক কী হয়। আমরা মোটেও ভীত নই।’ স্পেন কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তেও ইয়াামালের সঙ্গে একমত, ‘ফ্রান্স দারুণ ছন্দে আছে এবং আমাদের খেলার ধরন আলাদা। আমরা প্রতিপক্ষকে সর্বোচ্চ সম্মান করি, তবে আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো দলকে হারানোর সামর্থ্য আমাদের আছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তাদের অসাধারণ শক্তিমত্তা সম্পর্কে জানি। তবে এটাও জানি, সেমিফাইনালে তাদের হারানোর কৃতিত্ব একমাত্র আমাদেরই রয়েছে।’

অন্যদিকে ফ্রান্স আশা করছে, তাদের তারকাখচিত আক্রমণভাগ স্পেনের শক্তিশালী রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে। দেশ্যমের অধীনে তিনটি বিশ্বকাপের মধ্যে দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা ফরাসি দলে স্পষ্ট লক্ষ্য ও ঐক্যের ছাপ দেখা যাচ্ছে। এ বিশ্বকাপ শেষেই কোচের পদ ছাড়বেন দেশ্যম। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম দুই পরাশক্তি স্পেন-ফ্রান্সের মধ্যকার লড়াইয়ের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ ও রোমাঞ্চকর। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তারা একে-অপরের অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। নিচে তাদের মধ্যকার হেড টু হেড পরিসংখ্যান এ পর্যন্ত ৩৮টি ম্যাচে একে-অপরের মুখোমুখি হয়েছে। সামগ্রিক পরিসংখ্যানে ফরাসিদের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে স্প্যানিশরা। স্পেনের জয় ১৮ ম্যাচ, ফ্রান্সের ১৩ ম্যাচে জয়, ড্র হয়েছে ৭টি।

বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা তৃতীয় সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স। তবে আধুনিক ফুটবলে ফ্রান্সকে পরাশক্তিতে পরিণত করার কৃতিত্ব নিজের বলে মানতে নারাজ দেশ্যম। গত সপ্তাহে সাফল্যের রহস্য জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, ‘সম্ভবত খুব ভালো খেলোয়াড় থাকার কারণেই। তবে মনে হয়, আমি আমার কাজটাও খুব খারাপ করছি না। এটি একটি মানবিক যাত্রা। খেলোয়াড়দের আমি বেছে নিয়েছি, কিন্তু প্রতিদিন এ দলটির সঙ্গে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই খুশি, আর তাদের এত আনন্দ নিয়ে খেলতে দেখেও ভালো লাগে।’ দেশ্যমের প্রতি সেই ভালোবাসার প্রতিফলন দেখা গেছে খেলোয়াড়দের আচরণেও। গ্রুপ পর্বের মাঝপথে মায়ের মৃত্যুর কারণে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন দেশ্যম। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। এক ম্যাচ পর আবারও তিনি দলের সঙ্গে যোগ দেন। এমবাপ্পে বলেন, ‘যাই ঘটুক না কেন, এ দলের সবাই একসঙ্গে থাকা এবং কোচের পাশে দাঁড়ানো।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়