নিজস্ব প্রতিবেদক

  ১৮ ঘণ্টা আগে

দুবাইয়ে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই পুলিশ। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন। গতকাল বিকেলে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

বেনজীরকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন। তাকে পাসপোর্ট জালিয়াতি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি মহান জাতীয় সংসদকে অবহিত করছি যে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা কর্তৃক ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। গত ১১ এপ্রিল এটি পাঠানো হয়েছিল এবং আমরা বিষয়টি মনিটর করেছি। ইন্টারপোল ২০২৫/২৩৯ নম্বর ফাইল ও ৫৭৪/২০২৫ কন্ট্রোল নম্বরের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের প্রতি রেড নোটিশ জারি করে। ওই রেড নোটিশের মাধ্যমে ইন্টারপোল কর্তৃক সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অনুরোধ করা হয়।

তিনি বলেন, মহান সংসদের মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে জানাচ্ছি যে, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ, ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে প্রেরিত একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে যে, দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এবং তিনি বর্তমানে সেখানে আটক আছেন। মন্ত্রী আরো জানান, আমি এই মহান সংসদকে আরো অবহিত করছি যে, এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, ইউএই ফেডারেল ল’ নাম্বার ৩৯ অব ২০০৬ অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট (প্রত্যর্পণ প্রস্তাব) প্রেরণ করতে হবে।

তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ এবং ১০৯ ধারা; ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২), ২৬(২) এবং ২৭(১) ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে এনসিবি ঢাকা ইন্টারপোলের চ্যানেলের মাধ্যমে রেড নোটিশ প্রকাশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয়, বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গ্রেপ্তার-পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত-সংক্রান্ত দলিলাদি প্রস্তুত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক এক্সট্রাডিশন প্রপোজাল প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট প্রেরণ করে এনসিবি আবুধাবির সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক অতি দ্রুতই তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। তিনি আরো বলেন, এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হবো, ইনশাআল্লাহ। এর মাধ্যমে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

রেড নোটিশ ও মামলা : আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল ‘রেড নোটিশ’ জারি করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর ডিআইজি হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় বেনজীর আহমেদ হাতে লেখা পাসপোর্ট সমর্পণ করে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়াই অফিসিয়াল মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) গ্রহণের জন্য আবেদন করেন। সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও আবেদনপত্রে পেশা হিসেবে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে র‌্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালেও একইভাবে তথ্য গোপন করে পাসপোর্টের আবেদন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এজাহারে আরো বলা হয়, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার দাপ্তরিক পরিচয় সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র যাচাই না করে সাধারণ পাসপোর্ট ও ই-পাসপোর্ট ইস্যুর অনুমোদন দেন। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলা করা হয়।

বেনজীরের বিরুদ্ধে চলমান মামলা : বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতি মামলাসহ মোট ছয়টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে, যা বর্তমানে বিচারাধীন। গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন আদালত। এর আগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী জীশান মির্জা এবং দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা করে দুদক। মামলাগুলোয় বলা হয়, বেনজীর আহমেদ ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। তার স্ত্রী জীশান মির্জা ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার তথ্য গোপন করেছেন। বড় মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার এবং মেজ মেয়ে তাহসীন রাইসা বিনতে বেনজীর ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিপুল সম্পদ জব্দ : ২০২৪ সালের ১২ জুন আদালত বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা আটটি ফ্ল্যাট এবং প্রায় ২৫ একর ২৭ কাঠা জমি জব্দের আদেশ দেন। এসব সম্পদের মধ্যে ঢাকার বাড্ডা ও আদাবরের ফ্ল্যাট এবং নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরার জমি রয়েছে। এছাড়া দুই দফায় বেনজীর ও তার পরিবারের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, গুলশানের চারটি ফ্ল্যাট, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং তিনটি বিও হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। দুদক পরবর্তী সময়ে বেনজীর পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকায় আরো আটটি ফ্ল্যাটের সন্ধান পায়। এর মধ্যে ছয়টি আদাবরে এবং দুটি বাড্ডায় অবস্থিত। এসব ফ্ল্যাট জব্দেরও আদেশ দেন আদালত।

দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেন, বেনজীর পরিবারের সম্পদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব সম্পদ পাওয়া গেছে, আদালত সেগুলো জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার এবং র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তালিকায়ও তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়