বিশ্লেষণ

চীন-যুক্তরাষ্ট্র মর্যাদার লড়াই

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

মো. রাশেদ আহমেদ

বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ কিছু ইস্যু নিয়ে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভারত-চীন লাদাখ সীমান্তে চরম উত্তেজনা প্রশমিত না হতেই আবার নতুন করে বিশ্বের দুই অর্থনীতিক পরাশক্তি দেশ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের কূটনীতিক টানাপড়েন এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হট ইস্যু, যা দুদেশের মধ্যে মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ঐতিহাসিক বীজ বপন করেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের মধ্যস্থায় তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে চীন সফরের মধ্য দিয়ে। এরপর ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীন সফর করলে এক ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দুই দেশ। উল্লেখ্য, চীন জাতিসংঘের স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। ফলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বিস্তার রোধে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুদেশের বন্ধুত্বের সম্পর্কের দীর্ঘ পাঁচ দশক অতিক্রম করলেও কোনো দেশ তার নীতিগত সিদ্ধান্তের তেমন বড় কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি। কারণ হিসেবে উভয় দেশের বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সম্পর্ক সাময়িক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম অতীতের সব নীতি প্রথাকে বৃদ্ধাঙুল দেখিয়ে তীব্র চীনবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছেন। যার ফলে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এতে চীনের ক্ষতি হয় ১০০ বিলিয়ন ডলার। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। বাণিজ্যিক যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান হারিয়েছে তিন-চার লাখ লোক।

বর্তমান চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নজিরবিহীন তলানিতে পৌঁছেছে। গত ২২ জুলাই বুধবার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে হিউস্টনে চীনা কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দেয় মার্কিন সরকার। পর্যায়ক্রমে, অন্য দূতাবাস বন্ধেরও ইঙ্গিত দেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে চীনের মোট পাঁচটি দূতাবাস রয়েছে। একে রাজনৈতিক চরম উসকানি এবং কূটনীতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত হিসেবে উল্লেখ করে চীন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অভিযোগ করেছেন, চীন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ‘চুরি’ করছে বিধায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপে লক্ষাধিক মানুষ বেকার হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহরে শেংদুতে মার্কিন দূতাবাস বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে কমিউনিস্টশাসিত চীন সরকার। চীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে। বেইজিংভিত্তিক গবেষণা সংস্থা, সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের তথ্য মতে, ১৯৭৯ সালে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর বর্তমান সবচেয়ে খারাপ সম্পর্ক বিরাজ করছে দুদেশের মধ্যে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসকে শুরু থেকেই চীনা ভাইরাস হিসেবে উল্লেখ করে জোর গলাই বলেন, চীনের উহান ল্যাবরেটরি থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে চীন সাড়া বিশ্বে এ ভাইরাস ছাড়িয়েছে। চীন বরাবরই এই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব অস্বীকার করেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সত্যতার প্রমাণ দিতে পারেনি। এমনকি চীনা ভাইরাসের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠন এবং চীনকে একঘরে করে রাখতে তৎপর ট্রাম প্রশাসন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম হঠাৎ কেন এত তীব্র চীনবিরোধী নীতি গ্রহণ করল? বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নভেম্বরে মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঘরোয়া বিভিন্ন সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে চীনবিরোধী বৃহত্তর জনমতকে কাজে লাগাতে মরিয়া থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম। এমনকি বিশ্বে চীনে অর্থনীতির প্রভাব খর্ব করা এবং আগামীর বিশ্বনেতৃত্বের চীনের হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে ট্রাম প্রশাসন। হুয়াওয়ের মতো বিভিন্ন চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিচ্ছে ট্রাম্প। প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, গ্রাহকদের ওপর নজরদারি চালাতে বেইজিংকে সহযোগিতা করে হুয়াওয়ে। তবে হুয়াওয়ে ও চীন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইতোমধ্যে হুয়াওয়ের মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ৩০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বর্তমান উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মথ্যে বাণিজ্যিক ৭৩৭ বিলিয়ন ডলার আজ হুমকির সম্মুখীন। এ ছাড়া ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে আর কোনো দিন বিশ্বের কোথাও তারা এমন শক্তিকে মাথাচাড়া দিতে দেবে না, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বনেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ করতে পারে। অনেক দিন ধরেই চীনকে তারা ভবিষ্যতের সেই ধরনের চ্যালেঞ্জে মনে করছে। হংকং ইস্যুতে চীনের নতুন আইনপ্রণয়ন, উইঘুর মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সর্বশেষ তাইওয়ান ইস্যু বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য। চীন তাইওয়ান দখলে আগ্রাসী হলেও সেখানে বড় বাধা যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চুক্তি বিদ্যমান। যদিও বরাবর উপরোক্ত ইস্যুগুলো চীন নিজের বিষয় বলে উড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা আগামীতে ভূ-রাজনীতিতে দুই মেরূকরণে বিভক্ত হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিকট ভবিষ্যতে, যুক্তরাষ্ট্রে ও চীনকেন্দ্রিক নতুন আঞ্চলিক জোট তৈরি হতে পারে। এতে বিশ্বে সন্ত্রাস ও জঙ্গি মোকাবিলায়, কার্বন নিঃসরণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পিছিয়ে পড়বে বিশ্ব। আঞ্চলিক পারস্পরিক অবিশ্বাস প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। বাড়বে আঞ্চলিক সংঘাত। ইতোমধ্যে চীন এশিয়া অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারে বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারে বিনিয়োগের পরিমাণ কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। ইরানের সঙ্গে চীনের নতুন করে সাময়িক চুক্তি যার উদাহরণ মাত্র। চীনের মহাযঙ্গ কর্মসূচি ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’-এর ৬টি করিডোরের আওতায় ৬০টির অধিক দেশের অন্তর্ভুক্ত ভবিষ্যতে অর্থনীতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুবিধা দেবে চীনকেÑ সে কথা নিঃসন্দেহে উল্লেখ করা যায়। অন্যদিকে ট্রাম প্রশাসনের বহুবিধ বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে বিশ্বরাজনীতিতে বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বহুল প্রতীক্ষিত ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি প্রত্যাহার, মেক্সিকোর দেয়াল নির্মাণ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন এবং সর্বশেষ করোনাভাইরাসের সংকটকাল সময়ে বিশ্বনেতৃত্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ইত্যাদি, যা ট্রাম প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। যার ফলে বিশ্ব রাজনীতির মর্যাদার লড়াইয়ে বেশ পিছিয়ে ট্রাম প্রশাসন। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটেজিক স্ট্যাডিজের তথ্য মতে, সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে চীনের ব্যয় ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা এশিয়া সোসাইটি বর্তমান পরিস্থিতিকে শীতলযুদ্ধ বলে অভিহিত করেছে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেফ্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্বের জন্য করোনাভাইরাসের চেয়েও বেশি উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সতর্ক করেছেন, ‘করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে ?বিশ্ব এমন এক বিধ্বস্ত পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে, যা সামাল দেওয়ার মতো কোনো নেতৃত্ব পাওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সে পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলবে। চীনের এক গবেষণার তথ্য মতে, সাময়িক সংঘাতের সম্ভাবনা কম, কিন্তু মুক্তবাণিজ্যের কারণে গত কয়েক দশকে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা অনেকটাই থমকে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বর্তমান পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ সন্দেহাতীতভাবে আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি। এ ধরনের হুমকি মোকাবিলার সামর্থ্য বিশ্বের নেই বললেই চলে। কারণ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উভয় দেশের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং উদ্ধত আচরণ নয়, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন দুই পরাশক্তিকে আলোচনার টেবিলে বসা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। অন্যথায় এর ব্যত্যয় ঘটলে দুদেশের মর্যাদার লড়াই সংঘাতময় রূপ নিতে পারে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

 

"