নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম বছরে পদার্পণে শিক্ষার্থীদের ভাবনা

বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে লক্ষ্যে নোয়াখালীতে ২০০৬ সালে ২২ জুন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) যাত্রা শুরু হয়। ১৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, সবুজে সমরোহে ভরপুর সঙ্গে অতিথি পাখির স্বর্গভূমি ময়নাদ্বীপ খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টি। আজ ঐতিহ্যের ২০ বছর পেরিয়ে ২১তম বছরে পদার্পন করল প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের অনুভূতি, প্রত্যাশা ও ভাবনা তুলে ধরেছেন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিব মোহাম্মদ আরজু
উন্নয়ন ও অগ্রগতির আহ্বান
বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে আমার অনুভূতিটা একই সঙ্গে আনন্দের এবং কিছুটা আবেগের। কারণ, ক্যাম্পাসের সঙ্গে আমাদের জীবনের সেরা কিছু বছর জড়িয়ে আছে। ২০ বছরের পথচলায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীর সংখ্যায় অনেক বড় হয়েছে। তারপরেও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে যেমন ক্লাসরুম সংকট, আবাসন সংকট, উন্নত মানের রিডিং রুমের সংকট যা অতি দ্রুত সমাধান করা জরুরি। তবে ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে, আমার প্রত্যাশা একটু ভিন্ন এবং সুনির্দিষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে প্রশাসনের কাছে আমার মূল প্রত্যাশা থাকবে কয়েকটি জায়গায়- প্রথমত, আমরা চাই নোবিপ্রবি কেবল স্নাতক ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান না হয়ে মানসম্মত গবেষণার কেন্দ্র হয়ে উঠুক। বিশেষ করে আমাদের সেমিনার লাইব্রেরিগুলোর আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের জার্নালগুলোতে শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্যারিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যদি বিভিন্ন কর্পোরেট বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করা হয়, তবে আমাদের জন্য ইন্টার্নশিপ ও চাকরির সুযোগ সহজ হবে। ক্যাম্পাসে নিয়মিত জব ফেয়ার বা ক্যারিয়ার গাইডেন্স প্রোগ্রাম আয়োজন করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, পড়াশোনার পাশাপাশি মুক্তবুদ্ধি চর্চা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার পরিবেশ আরো প্রাণবন্ত হওয়া উচিত। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরো বেশি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া প্রয়োজন। সবশেষে বলবো, ২০ বছর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপক্কতা অর্জনের জন্য দারুণ একটা সময়। আমরা চাই, আমাদের পরম যত্নে গড়ে ওঠা এই ক্যাম্পাসটি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অগ্রযাত্রায় একজন ‘নোবিপ্রবিয়ান’ হিসেবে অবদান রাখতে পারাটা সবসময় গর্বের।
মোহাম্মদ নুরুন নবী
শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে আলো ছড়ানো একমাত্র প্রদীপ
‘একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি স্বপ্নের আশ্রয়, জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান এবং আগামী দিনের আলোকিত সমাজ নির্মাণের কারখানা। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ বছরের গৌরবময় পথচলা সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।’ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) গৌরবময় ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আমাদের জন্য এক আনন্দ, গর্ব ও আবেগের উপলক্ষ। দীর্ঘ বিশ বছরের পথচলায় এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং জ্ঞান, গবেষণা, মানবিক মূল্যবোধ ও নেতৃত্ব বিকাশের এক উজ্জ্বল কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কোলাহলমুক্ত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা ১০১ একরের এই সবুজ ক্যাম্পাসটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। নোবিপ্রবি আমার স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও আত্মগঠনের এক অনন্য ঠিকানা। নোবিপ্রবি দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এমনকি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়েও (যেমন- টাইমস হায়ার এডুকেশন) প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে আমার প্রত্যাশা- নোবিপ্রবি আরো সমৃদ্ধ হোক, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করুক।
শুভ ২০তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস।
জয় হোক জ্ঞানের, জয় হোক নোবিপ্রবির।
মৌমিতা নওশিন
শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
আছে প্রাপ্তি, রয়েছে সংকটও
প্রাণপ্রিয় ১০১ একরের ক্যাম্পাস, দেখতে দেখতে দুই দশক পার করে একুশতম বর্ষে পদার্পণ করলো। এই বিশ্ববিদ্যালয়েরর একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে সত্যিই অনেক গর্বিত এবং আনন্দিত। শত বাধা বিপত্তি পার করে হাজারো শিক্ষার্থী দেশের দূরদূরান্ত থেকে নোবিপ্রবিতে পড়াশোনার জন্য আসে। তবে শত বাধা বিপত্তি তাদের গুণগত শিক্ষা গ্রহণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেমন আবাসন সংকট চরমে, অন্যদিকে অপর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাব সুবিধা তাদের প্রধান বাঁধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে শিক্ষার্থী হিসেবে যতদ্রুত সম্ভব আবাসন সংকট সমাধানের জন্য প্রশাসনের নিকট দাবি জানাই। একইসঙ্গে প্রত্যেক বিভাগকে তাদের প্রাপ্য শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাব যথাযথ বুঝিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় প্রশাসন যেন সেদিকে সুনজর রাখে। একইসঙ্গে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে সকল কার্যকরী পদক্ষেপ গৃহীত ও বাস্তবায়িত হোক। কারণ দিনশেষে এই চার বছরের শিক্ষাই আমাদের অর্জিত সম্পদ। পরিশেষে এই বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে ১০১ একরের প্রাণের বিদ্যাপীঠের উত্তোরোত্তর সফলতা ও সমৃদ্ধি কামনা করি।
মোহাম্মদ তানভীর হোসেন
শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
একুশে পা নোবিপ্রবি: গর্ব, সংকট ও প্রত্যাশা
অনেক চড়াই উৎরাই পার করে নোবিপ্রবি আজ তার ২১তম বছরে পর্দাপন করছে। প্রতিষ্ঠার এই ২ দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রাপ্তি রয়েছে। বিশ্ব র?্যাংকিং, এশিয়ান র্যাংকিং, রিসার্চ আর্টিকেল কিংবা জাতীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অভাবনীয় অনেক সাফল্য। এই সবকিছুর পিছনে অবদান রয়েছে একঝাক শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের।
তবে প্রাপ্তির পাশাপাশি বেশ কিছু অপ্রাপ্তিও আছে, ক্লাস সংকট, ক্যাফেটেরিয়া, আবাসন সংকট সব কিছু যেন নোবিপ্রবিয়ানদের জন্য নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকল মাইলফলক নোবিপ্রবিয়ানদের তৃপ্তি দেয়, কিন্তু সব কিছুর শেষে একজন শিক্ষার্থীর চাওয়া একটু ভালো থাকা, একটু সুন্দর পরিবেশ পাওয়া। তাই একজন শিক্ষার্থী হিসেবে চাইবো এই সকল কিছুর সমাধান হোক। বিশ্ববিদ্যালয় সকল মত, সকল সংস্কৃতির মানুষ শান্তিতে থাকুক। আর কখনোা কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী কখনো অপরাজনীতির শিকার না হোক। আমার নোবিপ্রবি সকল সমস্যা কাটিয়ে উঠুক, আমরা সবাইকে নিয়ে একদিন একটি সুন্দর নোবিপ্রবি গড়বো ইনশাআল্লাহ। শুভ জন্মদিন প্রিয় নোবিপ্রবি।
তানজিলুর রহমান মুয়াজ
শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অপূর্ণতা
শোনা যায়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে হাঁটলেও অনেক কিছু শেখা যায়।’ এই কথাটি নিছক রূপক নয় বরং বাস্তব সত্য। এখানে বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নেতৃত্বগুণের বিকাশ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে দেখিয়েছে সংগ্রাম, প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার দৃঢ়তা, দেশকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন। শিখেছি কিভাবে দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে একটি আবেগের জায়গা। কিন্তু দিনদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স বাড়লেও আশানুরূপ সুযোগসুবিধা যা থাকা প্রয়োজন তা হয়ে ওঠেনি। আবাসন সুবিধা, ক্লাস রুম সংকট, শিক্ষক সংকট, ল্যাব ও লাইব্রেরিসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আশানুরূপভাবে বৃদ্ধি পায়নি। একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট মানসম্মত ল্যাব থাকাটা জরুরি, যা নেই। এছাড়াও প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো গড়ে ওঠেনি মুক্তমঞ্চ, টিএসসি, জিমনেসিয়াম ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে এটাই আশা করি, সব ধরনের সীমাবদ্ধতা ও সংকট দ্রুত নিরসন করে শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণা ও দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবায় অবদান রাখবে। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে।
রিয়াদুজ্জামান
শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
২২ জুন গর্ব ও ভালোবাসার এক বিশেষ দিন
রুজভেল্ট আইল্যান্ডের মতো পরম শান্তির আশ্রম, আমার তারুণ্যের শ্রেষ্ঠ অর্জন নোবিপ্রবির ১০১ একরের ক্যাম্পাস সেই অনবদ্য কবিতা যেখানে প্রিয় শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা, সিনিয়র-জুনিয়রদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সহপাঠীদের সঙ্গে এক ছাদের নিচে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা একই ছন্দে রচিত। ব্যস্ত ক্লাস শিডিউলের ফাঁকে সোনাজয়ী রোদেলা দুপুরে এখানকার সবুজ চত্বরে হেঁটে বেড়ানো কিংবা গোধূলি লগ্নে শহীদ মিনার, প্রশান্তি পার্ক, শান্তিনিকেতন অথবা নীল দিঘিতে বসে বন্ধুদের সঙ্গে জীবনের গল্প বোনা; এসব মুহূর্ত স্মৃতির মণিকোঠায় আজীবন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। আর আড্ডার চলন্ত ঠিকানা ‘লাল বাস’ প্রতিদিন ক্যাম্পাসে আসা এবং দিনশেষে ফেরার প্রতিটি মুহূর্তকে রূপ দিয়েছে অসংখ্য মধুর স্মৃতির অনন্য ভাণ্ডারে। পরিবারের বাইরে পাওয়া এই বৃহৎ পরিবার আমাকে শিখিয়েছে সহমর্মিতা, বন্ধুত্ব ও এগিয়ে চলার সাহস। এখানকার প্রতিটি মানুষের গল্প আলাদা, জীবনবোধ আলাদা। তবু তারা একই মালার ভিন্ন ভিন্ন ফুল। অসংখ্য হতাশায় ভেঙে পড়া তরীকে আলোর দিশা দেখিয়েছে এই মুক্ত ক্যাম্পাসের স্নিগ্ধ আলো। সৃজনশীলতাণ্ডসাহিত্যে-জ্ঞানে-গবেষণায় আলো ছড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে আমার বিশ্ববিদ্যালয় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে আর নোবিপ্রবির প্রতিটি শিক্ষার্থী হয়ে উঠবে আগামীর আলোকবর্তিকাণ্ড এটাই আমার বিশ্বাস, এটাই আমার প্রত্যাশা।
সেলিনা জিন্নাত ঐশী
শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
"









































