দশ বছরে সাত প্রধানমন্ত্রী, কোন অতলে ব্রিটিশ রাজনীতি?

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বিখ্যাত চকচকে কালো দরজাওয়ালা ভবনটি প্রায় ৩০০ বছরের ইতিহাসে বহু কিংবদন্তি রাজনৈতিক নেতার দীর্ঘ শাসনের সাক্ষী।
যেখানে উইনস্টন চার্চিল ৯ বছর, মার্গারেট থ্যাচার ১২ বছর কিংবা টনি ব্লেয়ার এক দশক টানা শাসন করেছেন, সেখানে গত ১০ বছরে ডাউনিং স্ট্রিটের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত এক দশকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরা যেন নিজেদের বাক্সপত্র গুছিয়ে ওঠার আগেই পরবর্তী নেতার জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
২০১৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সাতজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন দেখেছে যুক্তরাজ্য। অতি সাম্প্রতিক কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ এই রাজনৈতিক মিউজিক্যাল চেয়ার খেলাকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
কী এমন ঘটল যে, আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম সূতিকাগার বলা হওয়া একটি দেশে এমন নজিরবিহীন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হলো?
ব্রেক্সিট: যেখান থেকে সংকটের শুরু: ব্রিটিশ রাজনীতির এই দীর্ঘমেয়াদি ওলটপালটের মূল অনুঘটক হলো ২০১৬ সালের বিতর্কিত ব্রেক্সিট (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়া) গণভোট। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন রাজনৈতিক জুয়া হিসেবে এই গণভোটের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি নিজে ইইউ-তে থাকার পক্ষে ('রিমেইন' শিবির) প্রচারণা চালালেও, ফল যায় বিপক্ষে।
গণভোটের নাটকীয় পরাজয়ের পর ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। ব্রেক্সিট শুধু ক্যামেরনকেই ক্ষমতাচ্যুত করেনি, এটি কনজারভেটিভ ও লেবার—উভয় দলের ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক ভিত্তিতেও বড় ফাটল ধরিয়ে দেয়। এরপর থেকে যারাই ক্ষমতায় এসেছেন, ব্রেক্সিট-পরবর্তী জটিলতা ও অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে গিয়ে তাদের সবাইকে পতন গুনতে হয়েছে।
সংসদীয় ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ ফাঁকফোকর: যুক্তরাজ্যের শাসনব্যবস্থার একটি বিশেষ দিক হলো—ভোটাররা সরাসরি দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। ভোটাররা ভোট দেন নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার সংসদ সদস্য (এমপি) পদের জন্য। হাউস অব কমন্সে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, সেই দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হন।
যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যন্তরীণ ভোটের মাধ্যমে যেকোনো সময় তাদের নেতা পরিবর্তন করতে পারে, এমনকি তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন থাকলেও। যদি কোনো প্রধানমন্ত্রী নিজের দলের ভেতরে সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের আস্থা হারান, তবে সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই তাকে সরিয়ে নতুন নেতা নির্বাচন করা সম্ভব। গত ১০ বছরে ক্ষমতার এই দ্রুত পালাবদলের পেছনে এই সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি।
কনজারভেটিভদের শাসন: কেলেঙ্কারি ও অর্থনৈতিক ধস: ডেভিড ক্যামেরন সরে দাঁড়ানোর পর দীর্ঘ ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনামলে একে একে চারজন প্রধানমন্ত্রীর পতন ঘটে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে।
থেরেসা মে: ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ তীব্র কোন্দল ও বিভক্তি সামলাতে না পেরে ২০১৯ সালে চোখের জল ফেলে বিদায় নেন।
বরিস জনসন: 'গেট ব্রেক্সিট ডান' স্লোগান দিয়ে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেও করোনাকালীন লকডাউনের নিয়ম ভেঙে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে পার্টি করার কেলেঙ্কারি ('পার্টিগেট') এবং মিথ্যাচারের দায়ে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
লিজ ট্রাস: ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী। কোনো সুনির্দিষ্ট উৎসের নিশ্চয়তা ছাড়াই বড় ধরনের কর কাটছাঁটের 'মিনি বাজেট' পেশ করে তিনি দেশের অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারে ধস নামান। মাত্র ৪৫ দিন দায়িত্ব পালন করে তিনি পদ ছাড়েন।
ঋষি সুনাক: মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী তীব্র জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।
লেবার পার্টির ক্ষমতায়ন এবং স্টারমারের আকস্মিক পতন: ২০২৪ সালের জুলাইয়ে লেবার পার্টি বিপুল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর কিয়ার স্টারমার যখন ডাউনিং স্ট্রিটের দায়িত্ব নেন, তখন ভাবা হয়েছিল ব্রিটেনে হয়তো দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরবে। কিন্তু দুই বছর পার হওয়ার আগেই সেই স্বপ্নভঙ্গ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে তীব্র বিতর্কে জড়ান স্টারমার। তবে তার পতনের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় সাম্প্রতিক স্থানীয় কাউন্সিল ও আঞ্চলিক নির্বাচন। এই নির্বাচনে লেবার পার্টির নজিরবিহীন ভরাডুবির পর দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংসদ সদস্যরা স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেন। তীব্র অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে অবশেষে গত সোমবার ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগঘন ভাষণে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কিয়ার স্টারমার।
দ্বিদলীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং তৃতীয় শক্তির উত্থান: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে বারবার এই ক্ষমতার পরিবর্তন ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। ভোটাররা বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর চরম অসন্তুষ্ট। আর এই গণ-অসন্তোষকে পুঁজি করে মূলধারার রাজনীতিতে দ্রুত উঠে আসছেন ব্রেক্সিটের অন্যতম রূপকার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদর্শিক মিত্র নাইজেল ফারাজ। তার দল 'রিফর্ম ইউকে' সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে, যা ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে? বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে লেবার পার্টি তাদের নতুন নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্টারমারই অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন।
আপাতত দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের দৌড়ে এবং 'স্বাভাবিক উত্তরসূরি' হিসেবে মেকারফিল্ডের উপনির্বাচনে জয়ী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। তবে নতুন যিনিই ডাউনিং স্ট্রিটের ঐতিহ্যবাহী কালো দরজার পেছনে পা রাখুন না কেন, ব্রিটেনের ইতিহাসের এই দীর্ঘতম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার বৃত্ত ভাঙাই হবে তার জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।









































