সাজাদুল ইসলাম, উলিপুর (কুড়িগ্রাম)

  ৩ ঘণ্টা আগে

ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী

ডিজিটালের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে বেতারযন্ত্র

একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের আকাশে ভেসে আসত একটি পরিচিত শব্দ ‘এটি বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা। মুহূর্তেই যেন প্রাণ ফিরে পেত পুরো পাড়া। কারো উঠানে, কারো বারান্দায় কিংবা চায়ের দোকানের বেঞ্চে একটি ছোট্ট ট্রানজিস্টরকে ঘিরে বসতেন কৃষক, শিক্ষক, ছাত্র, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে গ্রামের প্রবীণ মানুষ। খবর, গান, নাটক, কৃষি পরামর্শ কিংবা ক্রিকেটের রুদ্ধশ্বাস ধারাভাষ্য- সব মিলিয়ে রেডিও ছিল একটি প্রজন্মের অনুভূতি, একটি সমাজের মিলনস্থল। সেই ট্রানজিস্টরগুলো ধুলামাখা তাকের কোণে পড়ে আছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় ইতিহাসের এই নীরব সাক্ষী যেন ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দৌলত মাস্টারের বয়স এখন সত্তর ছুঁইছুঁই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি যত্ন করে আগলে রেখেছেন প্রায় চার দশকের পুরোনো একটি ট্রানজিস্টর। সময়ের ছাপ পড়েছে যন্ত্রটির গায়ে, কিন্তু তার কাছে এর মূল্য আজও অমূল্য। ট্রানজিস্টরটি হাতে নিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই রেডিও শুধু একটা যন্ত্র নয়, এটা আমার জীবনের সঙ্গী। মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছি, স্বাধীনতার খবর শুনেছি, অসংখ্য খেলার ধারাভাষ্য শুনেছি। কত রাত যে এই রেডিওর পাশে কাটিয়েছি, তার হিসাব নেই। এখন সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু রেডিওর শব্দে যে মায়া, তা অন্য কোনো মাধ্যমে পাই না। একসময় বিদ্যুৎবিহীন বাংলার গ্রামে তথ্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল রেডিও। একটি ব্যাটারিচালিত ট্রানজিস্টরই ছিল সংবাদপত্র, বিনোদন, শিক্ষা এবং যোগাযোগের প্রধান ভরসা। কৃষকরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান শুনে মাঠে নামতেন। শিক্ষার্থীরা শুনতেন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান। গৃহিণীরা শুনতেন গান, নাটক ও স্বাস্থ্যবিষয়ক আয়োজন। আর সন্ধ্যার খবর ছিল যেন প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে রেডিওর ভূমিকা অনন্য। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিটি ঘোষণা, দেশাত্মবোধক গান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে প্রচারিত বার্তা লাখো মানুষের মনে জাগিয়ে তুলেছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সংগ্রামের সাহস। তাই রেডিও কেবল একটি গণমাধ্যম নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের হাতের মুঠোয় এখন স্মার্টফোন। ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুক, পডকাস্ট ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম মুহূর্তেই পৌঁছে দিচ্ছে পৃথিবীর সব খবর ও বিনোদন। ফলে ট্রানজিস্টরের সেই পরিচিত শব্দ আজ অনেকটাই নিস্তব্ধ।

উলিপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, ‘রেডিও সম্পর্কে জানি, কিন্তু কখনো নিয়মিত শুনিনি। আমাদের সব কিছু এখন মোবাইল ফোনেই পাওয়া যায়। তাই রেডিওর সঙ্গে আমাদের প্রজন্মের সম্পর্ক তৈরি হয়নি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘বাবা-দাদাদের কাছে রেডিওর গল্প শুনেছি। তারা বলতেন, খেলার ধারাভাষ্য শুনতে পুরো গ্রাম একসঙ্গে বসত। এখন সেই দৃশ্য শুধু গল্পেই আছে। কুড়িগ্রামের কমিউনিটি রেডিও চিলমারীর স্টেশন ম্যানেজার বশির আহমেদ বলেন, ‘ট্রানজিস্টরের ব্যবহার কমেছে, কিন্তু রেডিওর প্রয়োজন শেষ হয়নি। দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট না থাকলেও রেডিও চালু থাকে। মানুষের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দিতে এটি এখনো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যমগুলোর একটি। পাশাপাশি অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছেও রেডিওকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। গণমাধ্যম গবেষকদের মতে, প্রযুক্তির বিকাশ রেডিওর জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিলেও এর সামাজিক গুরুত্ব কমেনি। স্বল্প ব্যয়ে তথ্যপ্রচার, স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক সচেতনতা এবং দুর্যোগকালীন যোগাযোগে রেডিও এখনো অপরিহার্য। হয়তো আর কোনো দিন গ্রামের প্রতিটি উঠানে ট্রানজিস্টরকে ঘিরে মানুষের ভিড় হবে না। সন্ধ্যার নীরবতা ভেঙে বেতারের খবর শোনার সেই সম্মিলিত মুহূর্তও আর ফিরে আসবে না। তবু ইতিহাসের কিছু শব্দ কখনো হারিয়ে যায় না। তারা থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে, সংস্কৃতিতে, আবেগে। হয়তো কোনো এক নিস্তব্ধ বিকেলে ধুলামাখা একটি পুরোনো ট্রানজিস্টরের সুইচ অন করতেই আবার ভেসে আসবে পরিচিত সেই কণ্ঠ- আর মুহূর্তেই মনে হবে রেডিও শুধু একটি যন্ত্র ছিল না; এটি ছিল একটি সময়ের স্পন্দন, একটি জাতির স্মৃতি এবং মানুষের হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকা এক অমূল্য উত্তরাধিকার।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়