সুপ্রিয় চাকমা শুভ, রাঙামাটি

  ০৪ জুলাই, ২০২৬

ভারতের মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশে ব্যবহার

বাংলাদেশের নাগরিক অথচ জরুরি প্রয়োজনে আত্মীয়-স্বজন ও বাইরে লেখাপড়া সন্তানদের সঙ্গে যোগযোগ করতে হয় ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। দুর্গম পাহাড়ের চূড়া কিংবা লম্বা উঁচু গাছের মাথার ওপর ওঠে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্ক চালাতে হচ্ছে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নের প্রায় ১১ হাজার মানুষের।

ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদ ১৯৮৪ সালে সৃষ্টির পর প্রায় ৪২ বছর ধরে এ ইউনিয়নের বাসিন্দারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এ ইউনিয়নে ২৮টি গ্রাম ও ৯টি ওয়ার্ডে বিভক্ত। প্রায় ১১ হাজার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা চালু করলেও দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর অতিক্রম হওয়ার পরেও এ উপজেলায় এখনো পৌঁছায়নি বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা। বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ না করায় পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্ক দিয়ে যাবতীয় কাজ করেন দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নে বসবাস করা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরা। বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হয়। যা প্রতি বছর বিশাল মোটা অঙ্কের টাকা যাচ্ছে ভারতের রাজস্ব খাতে। এ ইউনিয়নে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা পাওয়ার আশা যেন আকাশ-কুসুম কল্পনার মতো।

বিলাইছড়ি সাইচল এলাকার পাশে জুরাছড়ির দুমদুম ইউনিয়ন। দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা পাওয়ার আশায় দিন গুণছেন বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন ও জুরাছড়ি উপজেলা সীমান্তবর্তীর সব জনগোষ্ঠীর মানুষ। বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক কাজ না করায় প্রযুক্তিগত দিক থেকে শুরু করে সব প্রকার দেশের তথ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি রাঙামাটি-চট্টগ্রাম-ঢাকা শহরে বিভিন্ন বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বড়ধরনের সমস্যায় দিন কাটাতে হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর মানুষের। সরেজমিনে ফারুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বিলাইছড়ি উপজেলায় সরেজমিনে যেসব চিত্র দেখা গেছে সেসব তুলে ধরা হলো-

রাজস্থলী অতিক্রম করার পর নেটওয়ার্ক কাজ করে না : রাঙামাটি সদর হতে বাঙ্গালহালিয়ার দিক দিয়ে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করার পর রাজস্থলী উপজেলা। রাজস্থলী ফায়ার সার্ভিস অতিক্রম করার পরে ফারুয়া রাস্তা সীমান্ত পার করার পরপরই বাংলাদেশের মোবাইল নেটওর্য়াক কাজ করে না। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা ফারুয়া ইউনিয়নে মেলেনি। কোনো জরুরি বিষয়ে কথা বলতে চাইলেও তা সম্ভব হয় না মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকাতে। ফারুয়ার বাসিন্দারা জরুরি প্রয়োজনে আত্মীয়-স্বজন ও সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে যেতে হয় সাইচল পাহাড়ের চূড়ায় নয়তো রাজস্থলী উপজেলায়।

ফারুয়া ইউনিয়নে নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক : ফারুয়া ইউনিয়নে সংখ্যাগরিষ্ঠ তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী বসবাস । এ ছাড়া এ ইউনিয়নে চাকমা-মারমা-রাখাইন ও বাঙালিরাও বসবাস করেন। তবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস খুবই কম। ফারুয়া ইউনিয়নে মোবাইল নেটওয়ার্ক আকাশ-কুসুম কল্পনা করা বলে মনে করেন রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দারা। ফারুয়া বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী মানুষের মিলনমেলা হয় ফারুয়া বাজারে। বাজারের ভেতর তেমন উন্নয়ন হয়নি। উন্নয়ন হয়নি রাস্তাঘাটেরও। নেই কোনো বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা। তবে এসব বাদ দিয়ে হলেও সব জনগোষ্ঠীর মানুষের একতাই দাবি তুলেছেন দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধার বিষয়ে।

সাইচলের পাহাড়ের চূড়ায় মেলে ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্ক : বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও ব্যবহার করতে হয় পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্ক। ফারুয়ার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাইচল এলাকায় দেখা গেছে, তরুণ-তরুণীরা পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় দাঁড়িয়ে ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে। বাড়ির ভেতরে ঢুকলে নেওয়ার্ক ভালোভাবে কাজ করে না। তাই কষ্ট করে হলেও গাছে ওঠে কিংবা পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হয়। বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হয় ফারুয়ার সাইচল এলাকাবাসীদের। সাইচল এলাকাবাসীরা ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধা পেলেও বাকি ফারুয়া ইউনিয়নের মানুষ সেই মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধাও পায় না।

ফারুয়ার স্থানীয়দের দাবি : দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন মোবাইল সিম কোম্পানির টাওয়ার বসানো হলেও এখনো ফারুয়া ইউনিয়নে মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা পৌঁছায়নি। সরকার আসে যায় আবার নতুন সরকার গঠন হয়। এভাবে রদবদল হওয়া সরকারের প্রতিনিধিরা বার বার মোবাইল নেটওয়ার্ক বিষয়ে আশ্বাস দিলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

এ প্রসঙ্গে ফারুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা উত্তম কুমার তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, রাঙামাটির বাইরে শহরে পড়াশোনা করে তার সন্তান। কোনো জরুরি প্রয়োজন হলেও সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না। রাজস্থলী উপজেলা সদরে গেলে তারপর সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। মোবাইল নেটওয়ার্ক না পাওয়াতে পুরো ১১ হাজার মানুষ ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছে। তিনি ক্ষোপ প্রকাশ করে বলেন- যে দল ক্ষমতায় আসে সেই দলের প্রতিনিধিরা আশ্বাস দেন মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধা দেওয়া হবে। বিভিন্ন কোম্পানির টাওয়ার বসানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও যুগ যুগ ধরে সেই ফারুয়া ইউনিয়ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ছাড়া রয়ে গেছে।

ফারুয়ার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রাসনা চাকমা বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ভারতের সিম দিয়ে সীমান্তে থাকা পাহাড়ি-বাঙালি মানুষের মাধ্যমে তারা মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা পেয়ে থাকেন। তবে বাংলাদেশের মোবাইল সিম কোম্পানির টাওয়ার হলে বেশি সুবিধা ভোগ করবেন এমন দাবি সেখানে বসবাস করা জনগোষ্ঠীর মানুষের।

ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধির ভাষ্য : ফারুয়া ইউনিয়নে মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা না থাকাতে ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে মোবাইলে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে মোবাইলে পাওয়া যায়নি। এক পর্যায়ে রাঙামাটি শহরে দেখা হয় ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনন্দ তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- দেশের অধিকাংশ উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছে গেছে। ফারুয়া ইউনিয়নে পাহাড়ি-বাঙালি মিলে প্রায় ১১ হাজারের অধিক মানুষের বসবাস।

উপজেলা প্রশাসনের মন্তব্য : সরকারের কিছু পরিকল্পনা থাকতে পারে। হয়তো সে কারণেই ফারুয়া ইউনিয়নে মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা নেই বা স্থানীয়রা মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন মন্তব্য করেছেন বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, বিলাইছড়ি উপজেলায় সবেমাত্র যোগদান করেছি। এর আগে ফারুয়ার কথা শুনেছি। যেহেতু মাত্র এ উপজেলায় যোগদান করেছি সেহেতু এ উপজেলার বিষয়ে অনেক কিছু অজানা। তারপরেও এ বিষয়টি মাথায় রেখে পরবর্তী আলোচনা সভায় এ সমস্যা উত্থাপন করে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়