মাটির নিচে ‘আগুনের কুণ্ডলী’, ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে ঢাকা!

ঢাকাকে ঘিরে ভূমিকম্পের ঝুঁকি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এক ভয়াবহ বাস্তবতা। নগরবিদ ও ভূ-তাত্ত্বিকরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে কেবল বহুতল ভবন ধসে পড়ার দৃশ্যই দেখা যাবে না, বরং শহরের বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে এক নিয়ন্ত্রহীন অগ্নিকাণ্ড।
গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে না পারার অক্ষমতা মিলে ঢাকাকে এক মরণফাঁদে পরিণত করতে পারে।
কেন অগ্নিকাণ্ডই হবে বড় বিপর্যয়: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের প্রত্যক্ষ ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও এর গৌণ প্রভাব অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে। ১৯০৬ সালের সান ফ্রান্সিসকো ভূমিকম্পের ঐতিহাসিক তথ্য এর প্রমাণ-সেখানে ৮০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল অগ্নিকাণ্ডের কারণে, মাত্র ২০ শতাংশ হয়েছিল সরাসরি ভবন ধসের কারণে।
ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে ঝুঁকিগুলো হলো গ্যাসের পাইপলাইন: ঢাকার মাটির নিচে গ্যাসের যে নেটওয়ার্ক, তা অত্যন্ত নাজুক। ভূকম্পনে এই পাইপলাইন ছিঁড়ে গিয়ে পুরো শহরে গ্যাস ছড়িয়ে পড়বে। যে কোনো স্ফুলিঙ্গ থেকেই তা হয়ে উঠবে আগুনের গোলা।
বিদ্যুৎ সরবরাহ: ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ ভূমিকম্পের সময় শর্ট সার্কিটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে বস্তি ও পুরনো শহরের সরু অলিগলিতে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।
পানির সংকট: ভয়াবহ এই পরিস্থিতির সময় পানির লাইনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে আগুন নেভানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাবে না। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন পানি খুঁজবেন, তখন সব উৎসই অকেজো হয়ে থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন: বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ আবু সাদেক এবং বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, এই ঝুঁকি মোকাবিলার প্রযুক্তি আমাদের হাতের নাগালেই রয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের ধীরগতি উদ্বেগজনক।
প্রস্তাবিত সুরক্ষাব্যবস্থা: কম্পন শনাক্তকারী সেন্সর (Seismic Sensors) বসানো। এটি ভূমিকম্পের প্রথম তরঙ্গ বা ‘পি-ওয়েভ’ শনাক্ত করে বড় কম্পন আসার আগেই বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
গ্যাস ও পানির পাইপলাইনের প্রতিটি বাঁক বা জয়েন্টে নমনীয় (flexible) প্রযুক্তি ব্যবহার করা, যাতে মাটির কম্পনে পাইপ ফেটে না যায়। তিতাস গ্যাসসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে 'সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকুইজিশন' (SCADA) সিস্টেম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা, যাতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে দূরবর্তীভাবে ভালভ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, ২০১৫ সালের দিকে এ ধরনের সিস্টেমের প্রস্তাব দেওয়া হলেও মাত্র ১৫ দিনের মাথায় সব কার্যক্রম থমকে যায়। তার মতে, ভূমিকম্পের পর মাত্র ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করতে না পারলে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো অসম্ভব।
নাগরিকদের করণীয়: রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাই হতে পারে জীবনের শেষ অবলম্বন।
শাট-অফ পয়েন্ট চিহ্নিতকরণ: বাড়ির প্রতিটি সদস্যকে জানতে হবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের মেইন সুইচ বা ভালভ কোথায়। এই পয়েন্টগুলো উজ্জ্বল রং বা চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত করে রাখতে হবে যাতে দুর্যোগের সময় অন্ধকারেও তা সহজে খুঁজে পাওয়া যায়।
নিরাপদ ব্যবস্থা: রান্নার সময় ভূমিকম্প হলে দ্রুত চুলা বন্ধ করা এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার মানসিক প্রস্তুতি থাকা।
ঢাকা শহরের বর্তমান কাঠামোতে বড় ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজ চালানো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। সরু সড়ক, যানজট এবং অগ্নিকাণ্ডের ফলে ধোঁয়া ও আগুনের তীব্রতায় উদ্ধারকারীরা কাজ করার মতো পরিবেশ পাবেন না। তাই, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কেনার চেয়েও বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত এই ‘প্রিভেন্টিভ’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
উন্নত বিশ্বের শহরগুলোতে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের বদলে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সচেতনতা তৈরির আগেই পাইপলাইন বসানোয় আজ আমরা এক বড় ঝুঁকিতে। সময় এসেছে এই ইউটিলিটি নেটওয়ার্ককে ঢেলে সাজানোর এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের। ভূমিকম্প বড় বিপর্যয় হতে পারে, কিন্তু সেই বিপর্যয়কে যেন অগ্নিকাণ্ড মহাবিপর্যয়ে রূপ দিতে না পারে, তার ব্যবস্থা এখন থেকেই নিতে হবে।









































