শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ

  ৩ ঘণ্টা আগে

চলনবিলের ফসল ও মাছ আনছে আর্থিক সমৃদ্ধি

শত বছরের প্রাকিৃতিক বিবর্তনে শস্য ও মৎস্যভাগুার খ্যাত চলনবিল টিকে আছে। তার চিরচেনা রূপ, যৌবন আর ঐতিহ্য আগের মতো নেই। শুষ্ক মৌসুমের আগেই বিল, নদী ও খাড়ি শুকিয়ে জেগে উঠে বিস্তীর্ণ মাঠ। সেই মাঠেই চাষ হয় ধান, সরিষা, রসুন, পেঁয়াজসহ নানা ধরনের শাকসবজি। চলনবিলে উৎপাদিত কৃষি পণ্য ও মৎস্যসম্পদ এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করছে। এনে দিচ্ছে বিলপাড়ের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

বর্ষা মৌসুমে চলনবিলে থৈ থৈ পানি চোখে পড়ে। আর শুষ্ক মৌসুমে সমগ্র বিলাঞ্চল থাকে শুষ্ক। খাল খনন করে পানি নিষ্কাশনের ফলে শুষ্ক মৌসুমে বিলে পানি চোখে পড়ে না। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছ ছাড়াও বিলে এখন অসংখ্য পুকুর কেটে বিদেশি হাইব্রিড মাছের সঙ্গে কুচিয়া মাছ চাষ করা হচ্ছে। নদী-বিল শুকিয়ে যাওয়া দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে ধান, পাট, সরিষা, রসুন, পেঁয়াজ, তরমুজ, বাঙ্গি, মরিচ, গাজর, শিম, কপি, আলু, পটোল, লাউসহ নানা প্রকারের ফসল আবাদ হচ্ছে। সবজির ব্যাপারীরা প্রতিদিন এ অঞ্চলের অমৃতকুণ্ডা হাট, মির্জাপুর হাট, ছাইকোলা হাট, মহিশলুটি হাটসহ ১২টি হাটবাজার থেকে লাউ, আলু, শিম, বেগুন, গাজর, কপি, টমেটোসহ বিভিন্ন প্রকার শাকসবজি কিনে পাবনা, রাজশাহী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাচ্ছেন। রপ্তানিকারকরা ঢাকা থেকে বিমানে সবজি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাকসহ অনেক দেশে রপ্তানি করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩৬৮ কিলোমিটার আয়তনের বিস্তীর্ণ চলনবিল অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে হয়ে উঠতে পারে বিপুল সম্ভাবনাময়। এ অঞ্চলের উৎপাদিত মাছ, মধু এবং সরিষা ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণে অনেকাংশে সক্ষম হয়েছে। পরিকল্পিত পদ্ধতিতে ইরি-বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করে দেশের খাদ্যঘাটতি নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চলনবিলে এখন বাণিজ্যিকভাবে কুচিয়া মাছ চাষ করা হচ্ছে। এই কুচিয়া মাছ এবং কাঁকড়া চীনে রপ্তানি করা হচ্ছে। গবাদিপশু, হাঁস, মুরগি, মৌমাছি পালন, শামুক, কাঁকড়া, চিংড়ি চাষের মাধ্যমে এ অঞ্চলের চাষিরা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো চাঙ্গা করে তুলছে। এ কারণেই চলনবিল খুলে দিয়েছে সমৃদ্ধির অপার সম্ভাবনা।

জানা যায়, সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বেড়া, নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া, নওগাঁ জেলার রানীনগর, আত্রাই এবং বগুড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চল মিলে চলনবিলের অবস্থান ছিল। কিন্তু ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনের পর থেকে রেলপথের উত্তর ও পশ্চিম অংশকেই চলনবিল বলা হয়। এম এ হামিদ টি কে ১৯৬৭ সালে ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বইতে লিখেছেন, তখন থেকে প্রায় ১৪০ বছর আগে অর্থাৎ ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলময় অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলের ওপরে। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপ কমিটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, তৎকালে বিলের আয়তন ছিল ১৪২ বর্গমাইল। এর মধ্যে ৩৩ বর্গমাইল এলাকায় সারা বছর পানি জমে থাকত। ওই রিপোর্টে বলা হয়, চলনবিল তার পানির স্রোতধারা ও নাব্য হারিয়ে ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে চলনবিল অঞ্চলের পানি নেমে গেলে সমতল ভূমি জেগে উঠে। তখন ওই সমতল ভূমি বা জমিতে চাষ হয় সরিষা, ধান, রসুনসহ নানা প্রকার রবি ফসল। পৌষ-মাঘ মাসেই ধানের চারা লাগানোর কাজ শেষ হয়ে যায়। কৃষি উৎপাদনে সেচের জন্য কৃষকরা ব্যবহার করছেন ভূগর্ভের পানি। বৈশাখ মাসেই ধান কাটা শুরু হয়। শুধু ধানই নয়, অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে আবাদ হয় নানা প্রকার শাকসবজি। এ অঞ্চলে মাছ, সরিষা, মধু উৎপাদনসহ নানা প্রকার মৌসুমি ফসল ফলছে। তবে উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর চাষিরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় মৎস্য চাষির সূত্রে জানা যায়, দেশের সর্ববৃহৎ জলাভূমি চলনবিল এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ বছরে প্রায় পাঁচ মাস বেকার জীবনযাপন করেন। বর্ষাকালে এই এলাকার কৃষি জমি পানিতে ডুবে যায়। তাদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। এ সময় অনেকে মাছ ধরার পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু একসময়ের মৎস্যভাগুার খ্যাত চলনবিলে এখন পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায় না। যে কারণে অনেকেই অন্য পেশায় যাচ্ছে ।

বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ)-এর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সিরাজগঞ্জ জেলা শাখা আহ্বায়ক দীপক কুমার কর বলেন, একসময় চলনবিলে সারা বছরই পানি থাকত। সে সময় চলন বিলে প্রচুর পরিমাণে নানা ধরনের মাছ পাওয়া যেত। এখানকার মাছ এদেশ ছাড়াও কলকাতা যেত। বিলের সুস্বাদু মাছের চাহিদা ছিল দেশব্যাপী। কালের বিবর্তনে আজ চলনবিলের অবস্থা বড়ই করুন। চলনবিল রক্ষায় অবিলম্বে বিলের ৪৮টির বেশি নদী, পাঁচ শতাধিক খাল দখলমুক্ত করে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে। এছাড়া বড়াল নদীর চারঘাট স্লুইসগেটসহ চলনবিলের অপরিকল্পিত সব অবকাঠামো অপসারণ করে দখল-দূষণকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

চলনবিল এলাকায় কোনো অবকাঠামো নির্মাণে পরিবেশগত মূল্যায়ন ও কঠোর আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করাসহ স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য দপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক দেবাশীষ ঘোষ বলেন, ৬ হাজার ২৭৫ জন তালিকাভুক্ত জেলে রয়েছে। এছাড়াও আরো অনেকেই বর্ষার সময় যুক্ত হয়। ১২ হাজার ২৮৪ দশমিক ৭৫ হেক্টর চলনবিলে বাৎসরিক মাছের উৎপাদন হয় ৫ হাজার ২৩০ দশমিক ৭৩ টন। এই বিলের টাটকা দেশীয় মাছের চাহিদা রয়েছে সারা দেশব্যাপী।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মওলা জানান, এ অঞ্চলের উৎপাদিত মধু এবং সরিষা ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণে অনেকাংশে সক্ষম হয়েছে। পরিকল্পিত পদ্ধতিতে ইরি-বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করে দেশের খাদ্য ঘাটতি নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বোরো মৌসুমে চলনবিল অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন করে দেশে খাদ্য ঘাটতি বহুলাংশে পূরণ করা সম্ভব। সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশন ও সেচের ব্যবস্থা করা হলে চলনবিল অঞ্চলের কৃষকের ধান উৎপাদনের পরিমাণ বাড়বে। এতে কৃষকরা ব্যাপকভাবে লাভবান হবেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়