ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন মুসা

  ৩ ঘণ্টা আগে

অতিথি কলাম

বাংলাদেশ কি পারবে প্রায়োগিক গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে?

গণতন্ত্র কোনো অলৌকিক সাফল্য নয়, এটি একটি নিরন্তর চর্চার বিষয়। বাংলাদেশে প্রতিটি আন্দোলনে সফলতা ও ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত হয়ে গেছে, সে কারণে যুক্তিতর্কের ক্ষেত্রগুলো আরো প্রসারিত হওয়া আবশ্যক; বিশেষ করে শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হওয়া বেশি জরুরি। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গণতন্ত্রকে কেবল একটি শাসনপদ্ধতি নয়, বরং রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও নাগরিক মর্যাদার সমন্বিত এক রূপ হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তায় গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, সাংবিধানিকতা এবং উন্নয়নের ধারণাগুলো সাধারণত পৃথক তাত্ত্বিক ধারায় বিকশিত হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতন্ত্রকে অনেক সময় কেবল ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক’ প্রক্রিয়া হিসেবে সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ বলে, নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রবেশদ্বার মাত্র, সম্পূর্ণতা নয়। একটি রাষ্ট্রে নিয়মিত নির্বাচন থাকতে পারে, কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণের ঘাটতি থাকলে সেই ব্যবস্থা কার্যকর গণতন্ত্রে পরিণত হয় না।

এই অচল অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের রাষ্ট্রচিন্তায় এ দেশে বাস্তবায়নযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তাই আমরা এমন এক রাষ্ট্রদর্শনের প্রস্তাব করছি যা কেবল তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিদিনকার অভ্যাসে প্রোথিত। এই দর্শনের মূলে রয়েছে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোর সাফল্য নির্ভর করে চারটি মৌলিক উপাদানের উপর : প্রথমত, শাসনকার্যের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার একক কেন্দ্রীভবন রোধে সাংবিধানিক চেক-অ্যান্ড-ব্যালেন্সের কঠোর প্রয়োগ; তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দক্ষ ও নিরপেক্ষ আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা; এবং চতুর্থত, জনগণের কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যা রাষ্ট্রকে ক্ষমতার দম্ভ থেকে সরিয়ে জনকল্যাণ ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার অঙ্গীকার করে। প্রয়োগিক গণতন্ত্রের এই ধারণা কেবল আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্রচিন্তার ফসল নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের প্রথিতযশা দার্শনিকদের চিন্তাধারার সঙ্গেও এটি গভীরভাবে সম্পৃক্ত। জন ডিউই (ঔড়যহ উববিু) গণতন্ত্রকে কেবল একটি শাসনপদ্ধতি নয়, বরং একে মানুষের ‘সহযোগিতামূলক জীবনধারা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক গণতন্ত্রের যে প্রস্তাব, তা ডিউই-এর এই অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষার দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে জর্গেন হেবারমাস (Jürgen Habermas) -এর ‘কমিউনিকেটিভ র‌্যাশনালিটি’ বা যোগাযোগমূলক যৌক্তিকতার ধারণা আমাদের এই দর্শনের মেরুদণ্ড। হেবারমাসের মতে, আইন যখন উন্মুক্ত জনপরিসরে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তখনই তা প্রকৃত গণতান্ত্রিক বৈধতা পায়। আবার আধুনিক প্রবক্তা ড্যানিয়েল অ্যালেন (উধহরবষষব অষষবহ) নাগরিক সহাবস্থান এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের যে সেতুবন্ধনের কথা বলেছেন, তা বাংলাদেশের মতো বৈচিত্র্যময় সমাজে রাজনৈতিক মেরুকরণ নিরসনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এই দার্শনিকরা প্রত্যেকেই একমত যে- গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জটিলতাকে মোকাবিলা করার হাতিয়ার হয়ে উঠে। অতীতের ভুল-ত্রুটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা অর্থহীন; যদি না ভুল থেকে শিক্ষা না নেই। অমর্ত্য সেনের সক্ষমতাভিত্তিক উন্নয়ন এবং ডগলাস নর্থের প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্ব প্রমাণ করে যে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্যের ভিত্তি হলো শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতি বদলের সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা। প্রস্তাবিত দর্শনে ‘রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা’ (ঝঃধঃব ঈড়হঃরহঁরঃু) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু অভিযোজনকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘ন্যাশনাল এজেন্ডা’ হিসেবে গ্রহণ করি, তখন তা বিশেষ কোনো সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয় না। বরং তা রাষ্ট্রের ধারাবাহিক উন্নয়নের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠে। এটি উন্নয়নকে দলীয় আবেগের বাইরে এনে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও পরিমাপযোগ্য কাঠামোতে নিয়ে আসে।

মঁতেস্কুর ক্ষমতার বিভাজন তত্ত্ব কোনো সরকারের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তৈরির ব্যবস্থা। ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নিশ্চিত করে যে, রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে, কিন্তু এককভাবে কারো উপর আধিপত্য করবে না। গণতন্ত্র কেবল ভালো সময়ের জন্য নয়, বরং সংকটের সময়ে তার প্রকৃত সক্ষমতা প্রমাণিত হয়। অ্যাপ্লাইড ডেমোক্রেটিক দর্শনে রাষ্ট্রের জরুরি ক্ষমতার একটি সুনির্দিষ্ট আইনি সীমারেখা থাকা প্রয়োজন। সংকটের সময় গণতন্ত্রের এই ‘স্থিতিস্থাপকতা’ (জবংরষরবহপব) একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা দেয়, যা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়। একইভাবে প্রযুক্তিনির্ভর শাসনের যুগে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স অপরিহার্য, কিন্তু তা যেন তথ্যের নজরদারিতে পরিণত না হয়। প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে নাগরিক ও রাষ্ট্রের দূরত্ব কমানোর জন্য- যেখানে সেবা পাওয়ার অধিকার হবে সহজ এবং সরকারের কাজের স্বচ্ছতা হবে উন্মুক্ত। এ ক্ষেত্রে ড্যাশবোর্ডভিত্তিক মনিটরিং এবং ওপেন ডেটা পলিসি অনুসরণ করলে সরকারি আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

এই রূপান্তরের সবচেয়ে মৌলিক ক্ষেত্র হলো শিক্ষাব্যবস্থা। আমরা বিশ্বাস করি, সংসদে গণতন্ত্র টিকে থাকে সংবিধানের মাধ্যমে, কিন্তু সমাজে গণতন্ত্র টিকে থাকে শ্রেণিকক্ষের সংস্কৃতির মাধ্যমে। বর্তমানের শিক্ষাক্রম সংস্কারের মাধ্যমে আমরা শ্রেণিকক্ষকে গণতন্ত্রের একটি ‘ল্যাবরেটরি’ বা পরীক্ষাগারে রূপান্তর করতে পারি। যদি আমরা কারিকুলামের ভেতরেই যৌক্তিক বিতর্ক, ভিন্নমতকে সম্মান জানানো এবং নাগরিক দায়বদ্ধতাকে গেঁথে দিতে পারি, তবেই একটি ‘নাগরিক সচেতন’ প্রজন্ম গড়ে উঠবে। শিক্ষার্থীরা তথ্যের চেয়ে যুক্তির উপর বেশি গুরুত্ব দিতে শিখবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনে সততা ও স্বচ্ছতার চর্চা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এখানে শিক্ষকরা কেবল তথ্য সরবরাহকারী নন, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ‘সাহায্যকারী’ বা ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে কাজ করবেন।

বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত এই প্রয়োগিক গণতন্ত্র উন্নয়নমূলক স্বৈরতন্ত্রের দক্ষতার দাবি এবং উদার গণতন্ত্রের স্বাধীনতার মূল্য- এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করে। এটি এমন এক রাষ্ট্রকাঠামোর প্রস্তাব করে যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহিতার বাইরে নয়। এই দর্শনের সাফল্য নির্ভর করবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কতটা গণতান্ত্রিক করা যায় তার উপর। গণতন্ত্র শুধু জাতীয় সংসদে সীমাবদ্ধ থাকলে তা তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছায় না। ইউনিয়ন, উপজেলা এবং পৌরসভাগুলোকে বাজেট গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া আছে অথচ যথাপোযুক্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া নেই। ইউনিটিগুলোকে স্বশাসিত করা হলে জনগণ নিজেদের শাসন প্রক্রিয়ার অংশ মনে করবে।

একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য কেবল ভোটের অধিকার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং নাগরিক কল্যাণের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি। আমাদের এখন সময় এসেছে ব্যক্তি নেতৃত্বের বন্দনা ছেড়ে প্রতিষ্ঠান নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেওয়ার। কারণ দিনশেষে স্থিতিশীলতা আসে প্রতিষ্ঠানের শক্তির মাধ্যমে, ব্যক্তির ইচ্ছার উপর ভর করে নয়। প্রস্তাবিত ‘প্রায়োগিক গণতন্ত্র’ এর ধারণা কোনো আকাশকুসুম কল্পনা নয়। এটি একটি সময়োপযোগী প্রস্তাব, যা শুরু হতে পারে আজকের শ্রেণিকক্ষ থেকে। যা বিস্তৃত হতে পারে স্থানীয় সরকারে এবং যা চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে একটি মজবুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় প্রতিষ্ঠানে। পরিবর্তনের এই সূচনা হতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাজীবী ফোরাম থেকে, যারা কেবল রাজনীতির দর্শক নয়, বরং রাষ্ট্রের অংশীদার। আগামীর বাংলাদেশ হবে এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে গণতন্ত্র কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। বরং তা প্রতিদিনের জীবন-চর্চার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ।

লেখকবৃন্দ : ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান, অধ্যাপক (অব.) রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং মোশাররফ হোসেন মুসা, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়