রোহিঙ্গাদের হাতে ১৭ লাখ সিম

* স্থানীয়দের নামে রেজিস্ট্রেশন * সীমান্তবর্তী মিয়ানমারেও বাংলাদেশি নেটওয়ার্ক * বাড়ছে খুন, মাদক লেনদেন ও তথ্যফাঁসের আশঙ্কা

প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

তাজুল ইসলাম পলাশ, উখিয়া থেকে

টেকনাফ ও উখিয়ার ৩০টি ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের বসবাস প্রায় ১১ লাখ। পরিবার রয়েছে আড়াই লাখের মতো। প্রতি পরিবারের লোক সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচজন করে। প্রতি ঘরে মোবাইল ব্যবহারকারী রয়েছেন দুজন। সেই হিসাবে রোহিঙ্গাদের অবৈধ সিম ব্যবহারকারী সংখ্যা ১৭ লাখের মতো। এমনকি অনেকের দুই চারটি সিমও রয়েছে। এসব সিম নামে বেনামে নিবন্ধন করা। অন্যের নামে অনিবন্ধিত সিম ব্যবহারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বাড়ছে অপরাধ আর রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচারের আশঙ্কা।

এসব সিম ব্যবহার করে খুন, ধর্ষণ ও মাদকদ্রব্য লেনদেনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি এসব অপরাধে কয়েকজন রোহিঙ্গা পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। আরাকানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ থাকাই রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচারের আশঙ্কা করছেন অনেকে। ফলে এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য ভবিষ্যৎ কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির নেতারা।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা এসব সিম দিয়ে মিয়ানমারের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রোহিঙ্গাদের ব্যবহৃত মোবাইল যাচাই বাছাই করে সিম সংগ্রহে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু এসব নির্দেশ মানা হচ্ছে না। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, উখিয়াবাজার, বালুখালি, থ্যাংখালি, কোটবাজার, টেকনাফের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত টাকা নিয়ে অন্যজনের নামে রেজিস্ট্র্রেশন

করা সিম বিক্রি করছে রোহিঙ্গাদের কাছে। ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশিরা কেউ সিম কিনতে গেলে আঙুলের একাধিক চাপ রাখেন। এনআইডি কার্ড কেউ ফটোকপি করতে গেলে আরো কয়েক কপি নিজেদের কাছে রেখে দেন। অন্যের আঙুলের ছাপ আর দরকারি কাগজপত্রের বিপরীতে আরো সিম নিবন্ধন করে, সেগুলো বিক্রি করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের কাছে। নাম জানাতে অনিচ্ছুক কুতুপালং বাজারের এক ব্যবসায়ী এসব কথা স্বীকার করলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি সিম ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

অনুসন্ধান আরো বলছে, ক্যাম্প এলাকায় টাওয়ার স্থাপনের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। অথচ এসব ক্যাম্পে আছে আটটির মতো টাওয়ার। এসব ক্যাম্পে বিকেল ৫টা থেকে পরদিন সকাল ৭টা পর্যন্ত মোবাইল ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, কিন্তু মানা হচ্ছে না। নেপথ্য স্থানীয় কিছু লোকের যোগসাজশ রয়েছে বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সরকারিভাবে স্থানীয়দের জন্য চালু হওয়া টেলিসেবার সুযোগ নিচ্ছে রোহিঙ্গারা। কুতুপালংয়ের রাস্তায় রোহিঙ্গা নারীদের মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেখা যায় হরহামেশায়।

কুতুপালং বাজার, লম্বাশিয়া, মধুরছড়াসহ পুরো ক্যাম্পজুড়ে অনেকগুলো মোবাইল সার্ভিসিং ও রিচার্জের দোকান রয়েছে। যেখান থেকে রোহিঙ্গারা সিম কিনেন। কুতুপালংয়ের ক্যাম্পের সামনের একটি দোকানে দেখা যায়, রোহিঙ্গা তরুণরা মোবাইলে রিচার্জ করছে, কেউ গান ডাউন লোড করছে। কেউ সিম কিনছে।

তবে সিম বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, আমরা মোবাইল চার্জ দিয়ে টাকা নিই। কিন্তু কোনো সিম বিক্রি করি না।

মিয়ানমারে থেকে যাওয়া স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দিতে বিভিন্ন ক্যাম্পে টেলিটকের ১০টি বুথ স্থাপন করা হলেও হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সেখানে রোহিঙ্গারা যাচ্ছেন না বলে জানিয়েছে টেলিটক কর্তৃপক্ষ। মূলত কুতুপালং ও উখিয়া বাজারে এই সিম পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, মিয়ানমারের সীমান্তের ভেতরেও বাংলাদেশি মুঠোফোন অপারেটরদের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। কয়েকজন রোহিঙ্গা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, সিম কিনতে তাদের কোনো কাগজপত্র লাগে না। কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ছাবের আহমেদ বলেন, আমি একটি মোবাইলে দুটি সিম ব্যবহার করি। যে দোকান থেকে মোবাইল সেট কিনেছি, সেই দোকানদার তাকে এই সিমটি দিয়েছেন। এইজন্য আলাদা কোনো কাগজ কিংবা টিপসই দিতে হয়নি।

কুতুপালং ২নং ক্যাম্পে এ ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছে রোহিঙ্গা হোসেন আহমেদের পরিবার। ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে চার্জে দেওয়া তার ছেলে ইমাম হোসেন নুরকে। তার কাছে আছে দুটি সিম।

এসব সিম যার নামে কেনা হচ্ছে সে ব্যক্তি হয়তো জানছেনই না তার নামে সিম কিনে চালাচ্ছেন অপর এক ব্যক্তি। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এ নিয়ে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তারা।

উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, নিয়মিত তাদের মনিটরিং করছি, বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়েছি। কয়েকজন মোবাইল ব্যবসায়ীকে আটকও করা হয়েছে। এবার বড় ধরনের অভিযান বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

 

"