বিশেষ প্রতিবেদক
চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

বর্ষা মৌসুম শুরু না হতেই চোখ রাঙাচ্ছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। রাজধানী থেকে এখন গ্রামে-গঞ্জে সবখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ সমান্তরাল। সর্বশেষ একদিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় তারা মারা যান। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১২৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮, ঢাকা বিভাগে ২, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৭, খুলনা বিভাগে ১৪, ময়মনসিংহ বিভাগে ২ এবং রাজশাহী বিভাগের ৮ জন রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন পুরুষ, তিনজন নারী। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১৮ জন, যাদের মধ্যে ১০ জন পুরুষ ও ৮ জন নারী।
গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১০০ ডেঙ্গু রোগী। চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৪৫৫ রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে। এর মধ্যে আবার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি। দুই যুগের বেশি সময় ঢাকা ছাড়াও দেশের প্রতিটি জেলায় ডেঙ্গু বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সরকার বাহারি উদ্যোগ নিলেও তা কাজে আসছে না। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে ১৮ জনের প্রাণ গেছে। এ সময় রোগটি শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার মানুষের শরীরে। যাদের অধিকাংশ রাজধানীর বাইরের বাসিন্দা। গত বছর দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এ সময় রোগটিতে মারা যান ৪১৩ জন।
গত বছরের নভেম্বরে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটি জরিপে দেখা যায়, বরগুনাসহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বড় পাত্র থেকে এডিস মশা, পানির সংকটের কারণে বংশবিস্তারে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। ২০২৩ সালে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গিয়েছিল। গত বছর আইইডিসিআরের কীটতাত্ত্বিক জরিপে দেখা যায়, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ঝিনাইদহ, মাগুরা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীর পৌরসভা এলাকা। ডেঙ্গু মোকাবিলায় গত ২ জুন এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালে ১০ শতাংশ বেড ফাঁকা রাখতে হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর টেস্টে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে হবে। শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ রোগী বহন করবে। ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পরামর্শ ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করতে হবে।
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে প্রাক-বর্ষায় এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করা হতো। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ থাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা এবার কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি। তবে প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রাক-বর্ষায় এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করেছে। সেখানে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো জরিপের তথ্য সামনে রেখে মশকনিধনে কাজ করবে বলে জানা গেছে। কীটতত্ত্ববিদরা বলেন, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে এবং তা ভয়াবহ হতে পারে। আগামী এক মাসের মধ্যে এডিসের বংশবিস্তার রোধ করতে হবে। এ সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কমিউনিটি মোবিলাইজেশন জরুরি।
সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এডিস মশার প্রজনন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বহুতল ও নির্মাণাধীন ভবনে এডিস নিয়ন্ত্রণে রিহ্যাব এবং ফ্ল্যাট মালিক সমিতির মাধ্যমে বছরব্যাপী জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম পরিচালনা এবং এডিস মশার উচ্চ ও মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বছরব্যাপী ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘ উষ্ণ সময়কাল এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে এখন ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে। সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হচ্ছে এবং দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘ডেঙ্গু একবার কোনো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তা ধীরে ধীরে ‘এপিডেমিক সাইকেল’ অনুযায়ী বাড়ে এবং একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে কমতে শুরু করে। ডেঙ্গুর বিস্তার মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে ভাইরাস, বাহক মশা এবং সংবেদনশীল মানুষ। ঢাকায় দীর্ঘদিন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থাকায় এখানে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ এরই মধ্যে কোনো না কোনোভাবে সংক্রমিত হয়েছে। ফলে এখানে সংক্রমণের হার এখন কিছুটা কমতির দিকে।’
"






































