বিশেষ প্রতিবেদক
এবারের বাজেট সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বস্তি এনে দেবে

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সুন্দর, স্বাভাবিক ও বাস্তবমুখী হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, এবারের বাজেট সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে। প্রস্তাবিত বাজেট পাসের আগে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন সংসদ নেতা তারেক রহমান। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ দ্রুত দেশে ফেরত আনার বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের করভার লাঘবে আরো কয়েকটি ক্ষেত্রে শুল্ককর কমানো, কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং দেশীয় শিল্প ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষার প্রসারে একাধিক জনবান্ধব সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘নরমালি দাবিটা বিরোধী দল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে ওনাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই।’ তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকারের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করেন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক ব্যয়ের এ ফর্দ নিয়ে সংসদ সদস্যদের আলোচনার পর তা পাস হওয়ার কথা। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। বাজেট আলোচনার সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করব্যবস্থাকে আরো স্বচ্ছ, আধুনিক ও করদাতাবান্ধব করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত আয়কর অব্যাহতির সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে ৪ লাখ এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি এ সীমা যথাক্রমে ৪ লাখ, সাড়ে ৪ লাখ এবং ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রাখছেন। প্রস্তাবিত বাজেটে স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান নিয়েও জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরির বিষয়টি নজরে আসার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমান বলেন, জমি প্রকৃত মূল্যে নিবন্ধন না হওয়ার কারণে করদাতাদের হয়রানি কমাতেই এ বিধান আনা হয়েছিল। তবে অনেকেই এটিকে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাই প্রস্তাবিত এ বিধান প্রত্যাহার করার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
করের আওতা বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলা, বণ্টননামা দলিল নিবন্ধন ও সম্পত্তি নামজারির ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবেও জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে বলে এ প্রস্তাবও প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান সরকারপ্রধান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বর্তমানে আরোপিত ১০ শতাংশ কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন তারেক রহমান। তবে শর্ত হিসেবে তিনি বলেন, কর-সুবিধার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে, ভাষা শিক্ষা ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব স্থাপন করতে এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। পার্বত্য ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কর-সুবিধা আরও সম্প্রসারণেরও প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানে পার্বত্য জেলায় পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত আয়ের করমুক্ত সুবিধার পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বেতনের আয়ও করমুক্ত করার সুপারিশ করেন তিনি।
চিংড়িশিল্পের প্রসার ও রপ্তানি বাড়াতে ফিড অ্যাডিটিভ, প্রোবায়োটিকস, ভিটামিন, মিনারেলস এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া স্থানীয় শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর সুপারিশ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওষুধ ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত মধু আমদানির ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। পাশাপাশি পিইটি রেজিন, পিভিসি, কোল্ড-রোলড শিট, রোল প্রোডাক্টের অক্সাইডসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহারের জন্যও অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবেই:
জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বিএনপি সবসময় কৃষি ও কৃষকের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। দলটি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, তখনই নদীর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত তিন মাসেই দেশে ৯০০ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়েছে। আগামী ৫ বছরে সারা দেশে আরও ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের নানামুখী সংকটকে আমরা অস্বীকারও করতে চাই না, আবার সংকটের অজুহাতও বানাতে চাই না। বরং সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করতেই আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে গ্রহণ করা অপরিকল্পিত ও লোক দেখানো ‘ভ্যানিটি প্রজেক্ট’র জন্য নেওয়া বৈদেশিক ঋণ বর্তমানে দেশের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান এই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে না দেখিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি ছিল অত্যন্ত নাজুক অবস্থায়। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, লুটপাট এবং ভুল নীতির কারণে অর্থনৈতিক কাঠামো কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অপ্রয়োজনীয় দেশি-বিদেশি ঋণ নিয়ে এমন অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, যেগুলো থেকে কোনো ধরনের আয় বা রাজস্ব আসে না। ফলে এখন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে এবং এর বোঝা দীর্ঘ সময় ধরে দেশকে বহন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অতীতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, পুঁজিবাজারে অসংখ্য মানুষ তাদের সঞ্চয় হারিয়েছেন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। একই সঙ্গে টাকার মূল্য প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। এই সংকটের বাস্তবতা সরকার অস্বীকার করে না, তবে এটিকে কোনোভাবেই অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে চায় না। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর নীতিমালার মাধ্যমে সরকার এই সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করতে চায়। সরকারের মূল দর্শন হলো দেশের স্বার্থে সবার আগে বাংলাদেশ এবং জনগণের কল্যাণে সবার জন্য বাংলাদেশ। এই নীতিকে সামনে রেখেই একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
উন্নয়ন কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরে আসবে, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতভাবে পাবেন বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
"






































