নিজস্ব প্রতিবেদক
অপ্টোমেট্রিস্টরা পাচ্ছেন রোগী দেখার সুযোগ

দেশে প্রথমবারের মতো অপ্টোমেট্রিস্টদের (চক্ষুবিষয়ক চিকিৎসা পেশাজীবী) আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। এখন থেকে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন অপ্টোমেট্রি ডিগ্রিধারী এবং এক বছর মেয়াদি ইন্টার্নশিপ সম্পন্নকারীরা ‘অপ্টোমেট্রিস্ট প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন। এর ফলে তারা ব্যক্তিগত চেম্বারে চক্ষু চিকিৎসাসেবা দিতে পারবেন।
এ বিষয়ে একটি নীতিমালাও প্রস্তুত করা হচ্ছে, যেখানে তাদের কার্যপরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত দেশের চক্ষু স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে চোখের সেবা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জানা গেছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় গত ১৩ মে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩৪ অনুযায়ী সরকার এ স্বীকৃতি দেয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আইনের প্রথম তফসিলের ৪(খ) ধারার আওতায় অপ্টোমেট্রি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি এবং এক বছর মেয়াদি ইন্টার্নশিপ সম্পন্নকারীদের ‘অপ্টোমেট্রিস্ট প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে স্বীকৃতি ও নিবন্ধনের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুমোদন করা হয়েছে।
চক্ষু স্বাস্থ্যসেবায় অপ্টোমেট্রিস্টরা দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, চশমা ও কনট্যাক্ট লেন্স নির্ধারণ, শিশু ও স্কুলভিত্তিক আই স্ক্রিনিং, ছানি, গ্লুকোমা ও ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত এবং রোগীকে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রতি দুই লাখ মানুষের জন্য রয়েছেন মাত্র একজন অপথালমোলজিস্ট। তাদের অধিকাংশই রাজধানী বা বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতিতে অপ্টোমেট্রিস্টরা প্রাথমিক চক্ষুসেবার সবচেয়ে কার্যকর মানবসম্পদ হতে পারেন। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত অপ্টোমেট্রিস্টের সংখ্যা মাত্র ২০০। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একজন অপথালমোলজিস্টের বিপরীতে চারজন অপ্টোমেট্রিস্ট থাকা প্রয়োজন। সেই হিসাবে দেশে প্রয়োজন অন্তত ৪ হাজার ৮০০ জন অপ্টোমেট্রিস্ট।
অপ্টোমেট্রি বিষয়ে প্রশিক্ষণ বর্তমানে সীমিত আকারে পরিচালিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অপথালমোলজি এবং রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ইত্তেহাদ কলেজ অব হেলথ সায়েন্স ও সাইক কলেজ অব হেলথ সায়েন্সে এ কোর্স চালু রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি স্বীকৃতির ফলে এ শিক্ষার সম্প্রসারণের পথ আরো উন্মুক্ত হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ দৃষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছেন, যার প্রায় ১০০ কোটি প্রতিরোধযোগ্য বা চিকিৎসাযোগ্য। সংস্থাটি চোখের স্বাস্থ্যকে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল জানিয়েছে, প্র্যাকটিশনার সনদ কার্যক্রম চালু হলে অপ্টোমেট্রিস্টদের দক্ষতা মূল্যায়ন, পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের জন্য মানসম্মত আই কেয়ার সেবা সম্প্রসারণ সহজ হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে নিবন্ধন প্রক্রিয়া, সনদ প্রদান, নীতিমালা প্রণয়ন এবং কার্যকর তদারকি কাঠামো পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। সর্বশেষ জাতীয় জরিপ (২০২১-২২) অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে জনসংখ্যার ০.৬৯ শতাংশ মানুষ অন্ধত্বের শিকার এবং প্রায় ৩ শতাংশ মানুষ ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন। চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৃষ্টিজনিত অন্যান্য সমস্যাও এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
অপ্টোমেট্রিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ দিদারুল আলম বলেন, সরকারের এ স্বীকৃতি অপ্টোমেট্রি পেশার জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ। অপ্টোমেট্রিস্টরা চক্ষুসেবার প্রথম সারির মানবসম্পদ। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক অঞ্চলে নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে অপ্রয়োজনীয় অন্ধত্ব অনেকাংশে কমানো সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অপ্টোমেট্রিস্টরা স্বাধীনভাবে চেম্বার পরিচালনা করেন। তারা প্রাথমিক থেকে জটিল চোখের চিকিৎসা, লো ভিশন ম্যানেজমেন্ট এবং প্রয়োজন হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের কাছে রোগী রেফার করেন। বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এ পেশাকে বিকশিত করতে হবে।
ফ্যাশন অপ্টিকস লিমিটেডের সিনিয়র অপ্টোমেট্রিস্ট আবীর দে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক এলাকায় প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের অভাব, সরকারি চক্ষু চিকিৎসক না থাকা এবং কার্যকর নিবন্ধন ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে পেশাটি কাঙ্ক্ষিত গুরুত্বপায়নি। অথচ দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন, যেখানে চক্ষু বিশেষজ্ঞের উপস্থিতি সীমিত। সে জায়গায় অপ্টোমেট্রিস্টরা সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারেন। তিনি বলেন, দৃষ্টি পরীক্ষা, চশমা প্রদান, শিশু ও স্কুলভিত্তিক আই স্ক্রিনিং, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জটিল রোগ শনাক্ত করে সময়মতো রেফার দেওয়ার ক্ষেত্রে অপ্টোমেট্রিস্টদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অপ্টোমেট্রিস্টদের কর্মসংস্থান কাঠামোও শ্রেণিবদ্ধ করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, অপ্টোমেট্রিস্টদের নিবন্ধন দেওয়ার উদ্যোগ ভালো। তবে এ পেশার কার্যক্রমে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি থাকতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে এটি দেশের চক্ষু স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ অপ্টোমেট্রিস্টদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের দোরগোড়ায় আধুনিক ও মানসম্মত চক্ষুসেবা পৌঁছে দিতে সরকার ইতিবাচকভাবে কাজ করছে। অপ্টোমেট্রি পেশার উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এ পেশাজীবীদের কার্যকর অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
"







































