সুজিত দেব, বিশ্বনাথ (সিলেট)
পৌরসভা ও ইউনিয়নের জটিলতায় আটকে হাজারো সুবিধাভোগীর ভাতা

সিলেটের বিশ্বনাথে বিধবা ও বয়স্ক ভাতা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় অসহায় বিধবা এবং দরিদ্র বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষেরা। বছরের পর বছর ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় ঘুরেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সরকারি এই সুবিধা। ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় কয়েক হাজার বিধবা ও বয়স্ক ভাতার আবেদন সমাজসেবা কার্যালয়ের ডাটাবেইজে ফাইলবন্দী হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯ সালে বিশ্বনাথ পৌরসভা গঠনের পর ২০২২ সালের ২ নভেম্বর পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিজয়ী প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন মুহিবুর রহমান। তবে ২০২৩ সালেও এই পৌরসভায় বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কোনো সরকারি বরাদ্দ ছিল না। নিরুপায় হয়ে পৌরসভার অনেক বাসিন্দাসহ পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য এলাকার বাসিন্দারাও ভাতার জন্য নিজ নিজ ইউনিয়নে আবেদন করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিন বছর আগে করা সেসব আবেদন এখনো অনুমোদন পায়নি, আবার বাতিলও হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে আবেদনগুলো সিস্টেমে ‘পেন্ডিং’ বা প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় ঝুলছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সরকারি সেবা পাওয়া নিয়ে চরম হতাশায় রয়েছেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সাল থেকে বর্তমান ২০২৫–২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সমাজসেবার ডাটাবেইজে বিধবা ভাতার আবেদন পেন্ডিং রয়েছে ৩ হাজার ৪৭টি, বয়স্ক ভাতার আবেদন পেন্ডিং রয়েছে ২ হাজার ৯৬টি এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর আবেদন পেন্ডিং রয়েছে ৪৯টি। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০২৫ সালের মে মাসে সমাজসেবা ডাটাবেইজে বিশ্বনাথ পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মাত্র ৩১ জন দরিদ্র বিধবা ও বয়স্ক ব্যক্তি ভাতা পান।
পৌরসভার বিশ্বনাথ পুরান বাজারের ভুক্তভোগী প্রান্ত বৈদ্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “২০২৩ সালে আমার মায়ের জন্য বিধবা ভাতার আবেদন করেছিলাম। তিন বছর হয়ে গেল, কোনো খবর নেই। ইউনিয়ন পরিষদে যোগাযোগ করলে তারা পৌরসভায় আবেদন করতে বলে। অথচ পুরোনো আবেদনটি সিস্টেমে পেন্ডিং থাকায় পৌরসভায় নতুন করে আবেদনও করতে পারছি না। এই গোলকধাঁধায় আমাদের সাহায্য করার মতো কেউ নেই।”
খাজাঞ্চী ইউনিয়নের ছোট দিগলী গ্রামের রিনা বেগম বলেন, “আমি বৃদ্ধ মানুষ, চলাফেরা করতে খুবই কষ্ট হয়। ২-৩ বছর আগে বয়স্ক ভাতার আবেদন করি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ভাতার কার্ড বা টাকা পাইনি। বহুবার ইউনিয়ন অফিসে যোগাযোগ করেও কোনো ফল না পেয়ে এখন নিরুপায় হয়ে ঘরে বসে আছি।”
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্বনাথ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দয়াল উদ্দিন তালুকদার জানান, পৌরসভা এলাকার আবেদনের দায়-দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের নয়। তিনি বলেন, “বিশ্বনাথ পৌরসভার আবেদনগুলো আমার দেখার কথা নয়। এবার আমি পুরো ইউনিয়নের জন্য মাত্র ১৮টি বিধবা ভাতার বরাদ্দ পেয়েছি, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। চলমান ভাতাভোগীদের মধ্যে কেউ মারা গেলেই কেবল সেই শূন্য পদে নতুন কাউকে সুযোগ দেওয়া সম্ভব।”
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, “বিশ্বনাথ পৌরসভা আমাদের ডাটাবেইজে ছিল না। আমি আসার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে ২০২৫ সালের মে মাসে পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড ফিল্টার করে ডাটাবেইজে অন্তর্ভুক্ত করি। ক্রমান্বয়ে নতুন আবেদনের পাশাপাশি পেন্ডিং থাকা আবেদনগুলো অনুমোদন দেওয়া হবে।”
বিশ্বনাথ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক জাহিদ বিন কাশেম বলেন, “যেহেতু আমি উপজেলায় নতুন যোগদান করেছি, তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে জনসাধারণকে দ্রুত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যাব।”
পিডিএস/এমএইউ









































