মোঃ লালমিয়া, তারাগঞ্জ (রংপুর)

  ১৭ ঘণ্টা আগে

শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে তারাগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

জাতীয়করণের দীর্ঘ সাত বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষক সংকট থেকে বের হতে পারছে না রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান 'তারাগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট (ও/এ) সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়'।

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকায় ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান। এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এবং এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে। দ্রুততম সময়ে শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা।

৫ শিক্ষক ও ২ কর্মচারীর পদ শূন্য বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালে স্থানীয় দানবীর আলহাজ টগরু মোহাম্মদ প্রামাণিক ৩ একর ২৮ শতাংশ জমি ওয়াকফ করে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৮ সালে এটি সরকারিকরণ করা হয়।

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভোকেশনাল শাখাসহ ১৭ জন শিক্ষক ও ৬ জন কর্মচারীর পদে অ্যাডহক নিয়োগ অনুমোদন করে। কিন্তু অবসর ও মৃত্যাজনিত কারণে প্রধান শিক্ষকসহ ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, ব্যবসায় শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার মতো ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে বর্তমানে মাত্র ১২ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম।

আইন বনাম বাস্তবতার ফারাক: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক ২৫ জন সহকারী শিক্ষক থাকার কথা। অথচ এই বিদ্যালয়ে মোট অনুমোদিত পদই মাত্র ১৭টি, যার মধ্যে ৫টিই আবার ফাঁকা! এছাড়া নৈশপ্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ২টি পদ খালি থাকায় প্রশাসনিক ও পরিবেশগত ভোগান্তিও বাড়ছে।

শিক্ষার্থীদের হাহাকার ও গৃহশিক্ষক-নির্ভরতা বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে সাধারণ শাখায় ৩১২ জন এবং ভোকেশনাল শাখায় ১৯০ জনসহ মোট ৫০২ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

শিক্ষার্থী ইব্রাহীম সরকার জানায়: “দিনে ৬ থেকে ৮টি ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষকসংকটে অনেক সময় ৩ থেকে ৫টির বেশি ক্লাস হয় না। ফলে সময়মতো সিলেবাস শেষ করা যাচ্ছে না।”

আরেক শিক্ষার্থী মাহী আক্তার বলে: “অনেক বিষয়ের শিক্ষকই নেই। ক্লাসে পড়া না হওয়ায় বাধ্য হয়ে বাসা ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।”

ধস নেমেছে ফলাফলে শিক্ষক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলেও:

২০২১ সাল: এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৯৪.৫৯%।

২০২৪ সাল: পাসের হার মারাত্মকভাবে কমে দাঁড়ায় ৬৪.১২%-এ।

২০২৫ সাল: পাসের হার কিছুটা বেড়ে ৭৭.৮% হলেও বিদ্যালয়টি থেকে একজন শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পায়নি।

অতিরিক্ত চাপে শিক্ষকরা, যা বলছেন কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বসুদেব রায় জানান, শূন্য পদ না পূরায় কর্মরত শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ বাড়ছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ পেলে তবেই পাঠদান স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মুসা সরকার বলেন, “প্রধান শিক্ষকের পদটি দীর্ঘদিন খালি। জনবল সংকটের কারণে আমরা শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান ও প্রত্যাশিত ফলাফল ধরে রাখতে পারছি না।”

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহীনুর রহমান সংকট তৈরির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “জাতীয়করণের পর বিসিএস (নন-ক্যাডার) থেকে পদায়ন বন্ধ থাকা এবং এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ না থাকায় এ জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।”

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোনাব্বর হোসেন বলেন, “শিক্ষক সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র ও দাপ্তরিক সুপারিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া গেলে বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়