মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম)

  ১ ঘণ্টা আগে

বাঁশখালীতে বন্যাদুর্গতদের পাশে প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা, চলছে খাদ্য সহায়তা

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও বন্যার পানিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সবকটি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক পরিবারের ঘরে পানি প্রবেশ করায় চুলায় আগুন জ্বলছে না। রান্না করতে না পেরে চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে বানভাসি মানুষের।

এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সমাজসেবক ও স্বেচ্ছাসেবীরা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে তাঁদের মানবিক উদ্যোগে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বানভাসি মানুষের মাঝে।

উপজেলা প্রশাসনের ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ইউনিয়নে রান্না করা ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মাধ্যমে এসব খাবার পানিবন্দী মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার, ১২৬ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি হাইজিন বক্স, পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার স্যালাইন এবং ১৫৬টি জেরিকেন পানি বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া জরুরি সহায়তার জন্য আরও ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং সদ্য বরাদ্দ পাওয়া ৫০ মেট্রিক টন চাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ওমর ফারুকের নেতৃত্বে নৌকাযোগে দুর্গম এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে শুকনো খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “বানভাসি মানুষের কী দুর্ভোগ, তা সরাসরি না দেখলে কেউ বুঝবে না। দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”

বিভিন্ন ইউনিয়নে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগ বৈলছড়ী ইউনিয়ন: এখানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দী হাজারো পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক সিআইপি ইব্রাহিম। প্রথম ধাপে ইউনিয়নের ২, ৩, ৫, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অতি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে চাল ও শুকনো খাবার তুলে দেওয়া হয়। বৈলছড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান বিকাশ দত্ত জানান, পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ওয়ার্ডের বন্যাকবলিত মানুষের মাঝেও সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে।

বাহারছড়া ইউনিয়ন: উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও বাহারছড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাস্টার লোকমান বলেন, “টানা বর্ষণে এই ইউনিয়নের প্রায় ৭-৮ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন। একই সময়ে এখানে পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।”

কাথরিয়া ইউনিয়ন: কাথরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও সমাজসেবক মো. হারুনুর রশিদ তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজ হাতে শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন।

চাম্বল ইউনিয়ন: চাম্বল ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল্লাহর নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে তিন শতাধিক পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। এই ইউনিয়নে প্রায় ৬-৭ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিম চাম্বল ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড।

একই ইউনিয়নের সমাজসেবক ও জামায়াত নেতা আলী নেওয়াজ চৌধুরী ইরান জানান, তাঁর এলাকার অবস্থা খুবই ভয়াবহ। ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ছয় শতাধিক পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন তাঁরা।

খানখানাবাদ ইউনিয়ন: বিশিষ্ট সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী আলহাজ মুহাম্মদ নিজামুল হক চৌধুরী সোহেল এবং তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে পুরো ইউনিয়নজুড়ে নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের এলাকার বানভাসি মানুষ খুবই কষ্টে আছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।”

শেখেরখীল ইউনিয়ন: সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ সাঈদ হোসেন চৌধুরী আরাফাতের নিজস্ব অর্থায়নে বিভিন্ন ওয়ার্ডে রান্না করা ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া শেখেরখীল লালজীবনসহ বিভিন্ন এলাকায় ৫০০ পরিবারের মাঝে চিকিৎসাসামগ্রী ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন চিকিৎসক দিদারুল হক সাকিব।

পৌরসভা, প্রেস ক্লাব ও রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র আলহাজ কামরুল ইসলাম হোসাইনীর পক্ষে পৌরসভার আস্করিয়া পাড়া ও খলিলশাহ পাড়াসহ আশপাশের এলাকায় শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন সাবেক ছাত্রনেতা এটিএম কপিল উদ্দিন, জিয়াউল হক জিয়া ও ওসমান গণী মুজাহিদ।

পাশাপাশি বাঁশখালী প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকেও শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। প্রেস ক্লাবের সদস্য সচিব মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের জানান, বানভাসি মানুষ খুবই কষ্টে আছে। এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক ও মানবিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

এ ছাড়া বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, নেজামে ইসলাম পার্টি, এনসিপি এবং খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিজস্ব উদ্যোগে ত্রাণ ও শুকনো খাবার বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

তবে বন্যাকবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়