শচীন্দ্র নাথ মন্ডল, দাকোপ (খুলনা)
দাকোপে নিষিদ্ধ জালের থাবায় অস্তিত্ব সংকটে দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণী

খুলনার দাকোপ উপজেলার খাল-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়গুলোতে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জালের অবাধ ব্যবহারে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় একশ্রেণীর অপেশাদার মৎস্য শিকারী সহজ লাভের আশায় এই ক্ষতিকর জাল ব্যবহার করায় একদিকে যেমন মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে চরম বিপাকে পড়েছেন এই পেশার ওপর নির্ভরশীল প্রকৃত জেলেরা।
পোনা ও মা মাছ নিধন, সংকটে প্রকৃত জেলেরা: স্থানীয় পেশাদার মৎস্যজীবীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আইনগত নিষেধাজ্ঞা এবং মাছের প্রজনন রক্ষার স্বার্থে তারা এই জাল ব্যবহার করেন না। তবে বর্ষায় পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে অপেশাদার শিকারীরা বিভিন্ন জলাশয়ে এবং খালের অল্প পানিতে এই সরু ফাঁসের লম্বা জাল পেতে রাখছেন।
চালনা খালের দীর্ঘ ৩০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জেলে আফজাল শেখ জানান, এই জালের কারণে বর্ষা মৌসুমে দেশি মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খালে সাধারণ খেওয়া জাল ফেললেও তা চায়না দুয়ারি জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে নদী-খালে আর কোনো দেশীয় মাছের অস্তিত্ব থাকবে না।
বনলাউডোব এলাকার পেশাদার জেলে পংকজ মণ্ডল বলেন, "আমরা পৈতৃক পেশায় মাছ ধরি। পোনা ও মা মাছ বাঁচলেই মাছের বিস্তার হবে। কিন্তু অপেশাদাররা নির্বিচারে সব ধরে ফেলায় জলাশয়গুলো থেকে দেশি মাছ পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ না হলে আমাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাবে।"
হুমকিতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য: পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ংকর ও বিপজ্জনক এই চায়না দুয়ারি জাল। হালকা ও সূক্ষ্ম বুননের কারণে এই জালে মাছের পোনা তো বটেই, প্রকৃতির জন্য উপকারী বিভিন্ন জলজ প্রাণীও আটকা পড়ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, জালে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে ব্যাঙ, সাপ, কুচিয়া, শামুক ও কাঁকড়াসহ নানা জাতের জলজ ও উপকারি পোকা-মাকড়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাজারে এই জালের বিপণন ও সরবরাহ বন্ধ না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও পদক্ষেপ: এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, "চায়না দুয়ারি জাল সরকার কর্তৃক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং মৎস্য আইনে এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। মূলত অপেশাদার জেলেরা বর্ষা মৌসুমে সহজ লাভের জন্য এটি ব্যবহার করে। এই জালের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আমাদের প্রচারণা ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, প্রশাসন ইতোমধ্যে এই অবৈধ জালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে জাল জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তা আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সব ধরনের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধে মৎস্যজীবীদের সচেতন করার পাশাপাশি অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি জানান।
পিডিএস/এমএইউ









































