প্রীতম দাস
মুক্তমত
নারীর অনলাইন স্বাধীনতা কি কেবলই একটি ধারণা?

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ- এ কথা আমরা কেউই অগ্রাহ্য করতে পারি না। কিন্তু এ দেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে নারীদের প্রাপ্য কতটুকু সম্মান দেওয়া হয়, সে বিষয়ে কি আমাদের যথেষ্ট ধারণা আছে?
সম্প্রতি এক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখতে পাই, একজন মেয়ের ফেসবুক সাধারণভাবে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসে, এবং সে সংখ্যাটি ৯৩৪ জন- যার মধ্যে ৯০৯ জন ছেলে এবং ২৫ জন মেয়ে। উল্লেখ্য, প্রাথমিকভাবে আমাকে (উক্ত মেয়ের আইডি) ‘হাই, হ্যালো’ ধরনের মেসেজ রিকুয়েস্ট দিয়েছে ১৩২ জন, যার মধ্যে ৩৬ জন বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল কথাবার্তা বলার চেষ্টা করেন। সবচেয়ে হয়রানিমূলক বিষয় হলো, এদের মধ্যে ১৩ জন ব্যক্তি সরাসরি অন্তরঙ্গ মুহূর্ত নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন এবং প্রস্তাব দেন। এ থেকে বোঝা যায়, এ দেশে নারীদের কেমন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।
ইউনেস্কো এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জার্নালিস্টস (ICFJ))-এর প্রকাশিত একটি জরিপ অনুযায়ী, ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া ও আরব দেশগুলোতে যৌন হয়রানিমূলক ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর ঘটনা বিশেষভাবে বেশি দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩০ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের মতপ্রকাশ কমিয়ে দিয়েছেন এবং ২০ শতাংশ সম্পূর্ণভাবে অনলাইন মিথস্ক্রিয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এই গ্লোবাল সার্ভে ২০২০ সালের অক্টোবরে শুরু হয়। ১২৫টি দেশ থেকে ৯০০-এরও বেশি নারী সাংবাদিক এতে অংশ নেন।
আবার জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার (UN Women) উদ্যোগে, ইউনেস্কো এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জার্নালিস্টস (ICFJ)-এর সহযোগিতায় ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অংশ নেওয়া ৪৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মী বলেছেন, তারা হয়রানি এড়াতে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের বক্তব্য সেন্সর করছেন- যা ২০২০ সালের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া ২২ শতাংশ বলেছেন, তারা কর্মক্ষেত্রেও সেন্সর করছেন। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে যে কর্মক্ষেত্র বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীরা সুরক্ষিত নন। তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন।
২০২৪ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও UNFPA-এর যৌথ জরিপে দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আর ১৮-৩০ বছর বয়সি নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। অর্থাৎ, প্রতিবেদন ও বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দেখা যাচ্ছে যে প্রতি বছর নারীদের প্রতি হেনস্তা ও নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মূলত এ ধরনের ঘটনার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকলেও উল্লেখযোগ্য হলো- বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার হার কম, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, সঠিক ও বিশ্বস্ত বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেলামেশার অভাব ইত্যাদি।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির মোট হার মাত্র ২৩.৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার উপযুক্ত বয়সের জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৭৬ শতাংশ মানুষ উচ্চশিক্ষার বাইরে থাকছেন। এ থেকে বোঝা যায় যে দেশের অধিকাংশ মানুষ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারছেন না এবং সমাজে চলাফেরার উপযুক্ত আচরণ শিখতে পারছেন না।
আবার কিছুসংখ্যক মানুষ রয়েছেন যারা উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও নিম্ন মনমানসিকতার পরিচয় দেন। সুতরাং, সমাজে সঠিকভাবে চলাফেরা করার জন্য পারিবারিক সুশিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা- দুটোই জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা অত্যাধিক। যখন কোনো একটি ঘটনা ঘটে এবং উক্ত ঘটনার পোস্ট কোনো ব্যক্তি বা পত্রিকাগুলো ফেসবুকে পোস্ট করে, সেখানে ইতিবাচক মতামতের পাশাপাশি অনেক নেতিবাচক মতামতও থাকে, যেগুলো থেকে বোঝা যায় মানুষের মানসিকতার অবস্থা কেমন।
২০২৬ সালের মে মাসে নাটোরে দুইজন রুশ নাগরিককে এ দেশের কিছু টিকটকারের দ্বারা উত্যক্ত করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পত্রিকায় ভাইরাল হয়। যদিও উক্ত টিকটকারকে পরবর্তীতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে, তবু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার জন্য এটি যথেষ্ট নয় কি?
আবার বিপরীতে দেখা যায়, যদি কোনো নারী অনলাইনে পেজ খুলে কোনো ব্যবসা বা স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করেন, সেখানে অনেক কুরুচিপূর্ণ কমেন্টস দেখতে পাওয়া যায়, যাতে করে উক্ত নারী স্বাবলম্বী হওয়ার পরিবর্তে আরো হেনস্থার শিকার হয়ে ঘরেই বসে থাকেন। অথবা কোনো নারী হেনস্তার কথা যখন আমরা অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশ করতে যাই, তখন উক্ত পোস্টের কমেন্ট সেকশন দেখলে বোঝা যায় আমরা কতটা জঘন্য মনমানসিকতার পরিচয় দিয়ে থাকি।
এ দেশের মানুষ কতটা বেকার থাকলে এবং কতটা পারিবারিক শিক্ষার অভাব থাকলে একজন অপরিচিত মেয়ের আইডিতে গিয়ে তাকে মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করে- এটা সহজেই বোঝা যায়। উল্লেখ্য, এসব ঘটনা দিন দিন ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অতএব, আমরা যদি আমাদের দেশকে একটি আদর্শ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে সর্বপ্রথম আমাদের নিজেদের মনমানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। অন্যথায় দেশ কখনো পরিপূর্ণ হবে না। কিছু একটা ঘটনা ঘটলেই আমরা সর্বপ্রথম পুলিশকে দোষারোপ করি অথবা বিভিন্ন অজুহাত দিই। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছি, আমরা যদি নিজেরা নিজেদের সঠিক পথে পরিচালনা করি, তাহলে পুলিশের কোনো প্রয়োজনই পড়বে না?
আমরাই পারি আমাদের দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করতে, সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে এবং স্বাবলম্বী হতে।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
"





































