মো. আদিল আহনাফ
দৃষ্টিপাত
অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন : এক নীরব অর্থনৈতিক ভাঙন

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ জাতীয় পর্যায়ে গর্বের বিষয় হলেও, এই কাঠামোগত রূপান্তর এমন একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা শারীরিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে ধসে পড়ছে। নদী থেকে অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন এখন কেবল স্থানীয় কোনো পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের জন্য একটি বড় ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বাহ্যিকভাবে নির্মাণ শিল্প ফুলেফেঁপে উঠলেও, গ্রামীণ অর্থনীতি এই তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-এর আড়ালে চড়া মূল্য পরিশোধ করে আসছে কয়েক দশক ধরে।
এই ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা হতবাক করার মতো। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নদীভাঙনের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। শত শত হেক্টর জমি নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। এর একটি বড় অংশ কেবল প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ নয়, বরং অপরিকল্পিত এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন ড্রেজিংয়ের সরাসরি ফল। ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার মডেলিং-এর সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, নদীর বালু প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ হারের চেয়ে বেশি হারে উত্তোলনের ফলে এক ধরনের ‘সাকশন ইফেক্ট’ বা শোষক শক্তি তৈরি হয়, যা নদীর পাড়কে অস্থিতিশীল করে তোলে, ফলে নদীভাঙনের সৃষ্টি হয় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কৃষি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
ফলে প্রতি বছর ব্যাপক হারে অর্থনৈতিক ক্ষতি বৃদ্ধি পায়। আর এই ক্ষতি এতটাই বিপর্যয়কর যে, তা আমাদের জিডিপি হিসাবের মধ্যেও খুব কমই উঠে আসে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণা অনুযায়ী, নদী তীরবর্তী জেলাগুলোতে ভূমি হারানোর দুই বছরের মধ্যে স্থানীয় পরিবারগুলোর আয় গড়ে ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। একজন কৃষক যখন অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে এক একর জমি হারান যার সম্ভাব্য ফসলের মূল্য লক্ষাধিক টাকা; তখন তিনি শুধু সম্পত্তি হারান না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির মূল করদাতাকেও হারিয়ে ফেলেন।
এ ছাড়াও, এখানে এক চরম আর্থিক অসংগতি লক্ষণীয়; সরকার প্রতি বছর নদীশাসন, বাঁধ মেরামত এবং জমি পুনরুদ্ধারের পেছনে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা খরচ করে। অথচ সরকার এর সামান্য অংশই রাজস্ব হিসেবে পায়, যা প্রায়শই দুর্নীতিগ্রস্ত ও নামমাত্র মূল্যের বালু মহাল ইজারার মাধ্যমে আসে। অবৈধ সিন্ডিকেটগুলোকে কাজ করার সুযোগ দিয়ে সরকার প্রকারান্তরে নিজেদের অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য ভর্তুকি দিচ্ছে। অবৈধ বালু ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত প্রতি ১ টাকার বিপরীতে, ভবিষ্যতে অবকাঠামো মেরামত ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জাতিকে প্রায় ৪ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, পরিবেশগত ক্ষতি এই সংকটকে আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে নদীগুলোতে পানির ঘোলাটে ভাব ৩০০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে, যা স্থানীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ফলে নদী অববাহিকায় অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদন ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা লাখ লাখ জেলে পরিবারের জীবিকাকে নীরবে ধ্বংস করছে। ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ বিদ্যমান থাকলেও এর প্রয়োগ কেবল একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। ভূ-স্থানিক পর্যবেক্ষণের অভাব এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা সিন্ডিকেটগুলোকে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ ছাড়াই কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে সিন্ডিকেটগুলো নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং দেশকে ও জাতিকে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আসন্ন ভয়ানক বিপর্যয় এড়াতে সরকারের অবশ্যই সক্রিয় অবস্থানে যেতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ভিয়েতনাম বা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশে প্রচলিত স্যাটেলাইটভিত্তিক মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের জন্য ‘নির্দিষ্ট ও নিরাপদ এলাকা’ নির্ধারণ করা। বালু ইজারাদারদের জন্য একটি ‘এনভায়রনমেন্টাল বন্ড’ জমা রাখা বাধ্যতামূলক করা, যাতে সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ সেখান থেকে আদায় করা যায়। এ ছাড়াও নদীর বালুর ওপর তীব্র নির্ভরশীলতা কমাতে টেকসই নির্মাণ সামগ্রীর উৎপাদন ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অদ্ভুত বিষয় হলো, এসব পদক্ষেপ গ্রহণ না করে ?সরকার বর্তমানে স্বল্পমেয়াদী নির্মাণ শিল্পের প্রসারের জন্য দেশের ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখছে। সরকার যদি এই ‘বালু মাফিয়া’ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে গ্রামীণ বাংলাদেশ পুনর্নির্মাণের খরচ বালু থেকে পাওয়া মুনাফার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হবে। উন্নয়ন টেকসই হতে হবে, নতুবা এটি কেবল ধীরগতির একটি পতন ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক : শিক্ষার্থী, আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
"





































