মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার

  ০৯ মে, ২০২৬

মতামত

ফ্রি পাঠ্যবই ও শিক্ষায় বাংলাদেশের বৈশ্বিক বার্তা

বিশ্বজুড়ে যখন শিক্ষা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, বাণিজ্যিকীকরণ এবং বৈষম্যের কারণে বহু শিশু মানসম্মত শিক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ একটি ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। এখানে শিক্ষা শুধু নীতিগত ঘোষণা নয় বাস্তব প্রয়োগের এক দৃশ্যমান রূপ। প্রতি বছর ৩০-৩৫ কোটি পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করে রাষ্ট্র প্রমাণ করেছে, চাইলে শিক্ষা অধিকারকে কাগজ থেকে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এই কর্মসূচি কেবল বই বিতরণ নয়; এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দর্শন, যেখানে সমতা, সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ একই সুতোয় গাঁথা। শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। এই নীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে যে কয়টি দেশ কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। প্রতি বছর ৩০-৩৫ কোটি পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণের যে কর্মসূচি, তা শুধু পরিসংখ্যানগতভাবে বড় নয় এটি একটি সুসংগঠিত, সমন্বিত ও মানবকেন্দ্রিক শিক্ষানীতির প্রতিফলন। ইতিহাস, উদ্দেশ্য, প্রণয়ন, মুদ্রণ, বণ্টন, ব্যবস্থাপনা, গুণগত মান, শিক্ষার্থীদের উৎসাহ ও গ্রহণ সব দিক থেকেই এই কর্মসূচি বিশ্বে অনন্য।

প্রথমে ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্র শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘদিন বই সংগ্রহ ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা বছরের শুরুতেই বই পেত না; অনেকেই মাঝপথে বই কিনতে না পেরে পড়াশোনা ছেড়ে দিত। এই বাস্তবতা থেকে ধাপে ধাপে নীতিগত পরিবর্তন আসে। নব্বইয়ের দশকে প্রাথমিক স্তরে বিনামূল্যে বই দেওয়ার পরিধি বাড়ানো হয়, তবে তা ছিল আংশিক ও অনিয়মিত। ২০১০ সালে এসে একটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর হাতে বছরের প্রথম দিনেই নতুন বই তুলে দেওয়া হবে। এই সিদ্ধান্তই ‘বই উৎসব’কে জন্ম দেয় এবং একটি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগকে রূপ দেয় জাতীয় আন্দোলনে।

এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য বহুমাত্রিক। প্রথমত, শিক্ষা ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করা- যাতে অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে কেউ পিছিয়ে না পড়ে। দ্বিতীয়ত, ঝরে পড়া কমানো- বই না থাকলে শিক্ষার্থী ক্লাসে টিকে থাকতে পারে না। তৃতীয়ত, শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা নতুন বই হাতে পাওয়ার আনন্দ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে উদ্দীপিত করে। চতুর্থত, জাতীয় কারিকুলামের একক বাস্তবায়ন সব শিক্ষার্থী একই মানের বই পেলে শেখার ভিত্তি একীভূত হয়। এই উদ্দেশ্যগুলো মিলেই কর্মসূচিটিকে শুধু একটি সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে এনে একটি সামাজিক বিনিয়োগে পরিণত করেছে।

বই প্রণয়নের বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দায়িত্বে রয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, বিষয়বস্তুর কাঠামো তৈরি, লেখক নির্বাচন, সম্পাদনা ও পর্যালোচনা সবকিছু একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ শিক্ষক, ভাষাবিদ ও সম্পাদকের সমন্বয়ে বই তৈরি করা হয়, যাতে তা শিক্ষার্থীবান্ধব, প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী হয়। এখানে কেবল তথ্য প্রদান নয়, বরং দক্ষতা, মূল্যবোধ ও চিন্তাশক্তি বিকাশের দিকটিও গুরুত্ব পায়।

এরপর আসে মুদ্রণ প্রক্রিয়া যা এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ। ৩০-৩৫ কোটি বই ছাপা মানে হাজার হাজার টন কাগজ, শতাধিক ছাপাখানা, এবং অত্যন্ত কঠোর সময়সীমা। সরকারি ও বেসরকারি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়, টেন্ডারের মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন হয়। প্রতিটি বইয়ের কাগজ, ছাপা, বাঁধাই সবকিছুর মান নির্ধারণ করা থাকে। সময়মতো উৎপাদন নিশ্চিত করতে একাধিক পর্যায়ে তদারকি করা হয়। এই বিশাল মুদ্রণ কার্যক্রম নিজেই একটি শিল্প খাতকে সচল রাখে।

বণ্টন বা বিতরণ ব্যবস্থাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা হয়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ে বই পৌঁছানো হয়। এই প্রক্রিয়াটি সময়নিষ্ঠ হতে হয়, কারণ লক্ষ্য থাকে পাশেই ১ জানুয়ারি প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেওয়া। ‘বই উৎসব’ শুধু একটি প্রতীকী অনুষ্ঠান নয়; এটি প্রশাসনিক দক্ষতার পরীক্ষাও। প্রত্যন্ত চর, পাহাড়ি এলাকা বা দুর্গম গ্রাম সব জায়গায় বই পৌঁছানো এই ব্যবস্থার সাফল্যের প্রমাণ।

ব্যবস্থাপনা দিক থেকে এটি একটি বহুস্তরীয় সমন্বিত উদ্যোগ। নীতিনির্ধারণ, বাজেট বরাদ্দ, কারিগরি বাস্তবায়ন, তদারকি- সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ছাড়া

এটি সম্ভব নয়। এই ব্যবস্থাপনা দক্ষতাই কর্মসূচিটিকে টেকসই করেছে।

তবে গুণগত মান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এত বিপুল পরিমাণ বই ছাপার ফলে কখনো কখনো ছাপার ভুল, কাগজের মান বা বাঁধাইয়ের সমস্যা দেখা যায়। এজন্য মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বহুপদক্ষেপে প্রুফ রিডিং, স্বাধীন অডিট এবং প্রতিক্রিয়া সংগ্রহের মাধ্যমে এই মান উন্নয়ন করা যেতে পারে। গুণগত মান নিশ্চিত না হলে পরিমাণের সাফল্য অর্থহীন হয়ে পড়বে।

লেখার দিক থেকেও পরিবর্তন প্রয়োজন। আধুনিক বিশ্বে শুধু তথ্যভিত্তিক বই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিশ্লেষণধর্মী, সৃজনশীল ও দক্ষতাভিত্তিক কনটেন্ট। শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে এমন উদাহরণ, সমস্যা সমাধান, এবং সমালোচনামূলক চিন্তার সুযোগ থাকা উচিত। এতে বই হবে শেখার একটি সক্রিয় মাধ্যম, শুধু পরীক্ষার উপকরণ নয়।

শিক্ষার্থীদের উৎসাহ এই কর্মসূচির একটি অনন্য দিক। বছরের প্রথম দিনে নতুন বই হাতে পাওয়ার আনন্দ একটি সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এটি বছরের সবচেয়ে আনন্দের দিন। এই ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তাদের শেখার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এবং বিদ্যালয়ের সঙ্গে মানসিক বন্ধন তৈরি করে। শিক্ষা তখন আর বাধ্যবাধকতা নয়, বরং আনন্দময় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকেও এই কর্মসূচি সফল। অভিভাবকরা এটিকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ এটি তাদের অর্থনৈতিক চাপ কমায়। শিক্ষকরা একক বইয়ের মাধ্যমে পাঠদান সহজভাবে পরিচালনা করতে পারেন। সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা যায় রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব নিচ্ছে। ফলে এই উদ্যোগটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে এবং একটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এই কর্মসূচির অনন্যতা স্পষ্ট। অনেক দেশেই আংশিকভাবে বই সরবরাহ করা হয়, কোথাও ধার ব্যবস্থায়, কোথাও নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য। কিন্তু বাংলাদেশে যে পরিসরে ৩০-৩৫ কোটি বই এবং যে পদ্ধতিতে সর্বজনীন, বিনামূল্যে, একই দিনে এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা বিরল। এটি শুধু একটি শিক্ষানীতি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রতিফলন।

৩০-৩৫ কোটি বই বিতরণের এই কর্মসূচি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়- উন্নয়ন শুধু বড় অবকাঠামো নয়, মানুষের ভিত গড়ে তোলার মধ্যেই তার স্থায়িত্ব। তবে এই সাফল্যে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। গুণগত মান, আধুনিকীকরণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারলে এই অর্জন স্থায়ী হবে না। এখন প্রয়োজন পরিমাণের গর্ব থেকে গুণগত উৎকর্ষে উত্তরণ। যদি বাংলাদেশ এই রূপান্তর ঘটাতে পারে, তবে এই কর্মসূচি শুধু একটি জাতীয় সাফল্য নয়; এটি হয়ে উঠবে বৈশ্বিক শিক্ষানীতির জন্য একটি তীক্ষè, কার্যকর এবং অনুসরণযোগ্য মডেল।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, প্রশিক্ষক ও লেখক

পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, মালয়েশিয়া

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়