মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
মতামত
পরিবেশ সুরক্ষায় প্রয়োজন পরিকল্পিত বনায়ন

প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালা ও পশুপাখির ভূমিকা অপরিসীম। গাছপালা বায়ুমণ্ডলের উত্তাপ কমিয়ে দিয়ে বাতাসে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং বাতাস থেকে কার্বন-ডাইঅক্সাইড শুষে নেয়। এমনকি বন যানবাহনের কালো ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বায়ুমণ্ডলকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। বনাঞ্চল, বিশেষ করে, ঝড়ঝঞ্জা, সাইক্লোন, বন্যা ও জলোচ্ছ্ব¡াসের হাত থেকে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। উপকূলীয় বনে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় বলে বাতাস আর্দ্র থাকে। বনভূমি যেকোনো উৎস থেকে আসা পানিপ্রবাহের চাপ কমায় এবং ভূমিক্ষয় ও ভূমিধস থেকে দেশের মাটিকে রক্ষা করে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়গুলো দেশের বিভিন্ন স্থানসহ উপকূলীয় এলাকার বিশাল একটি অংশ লণ্ডভণ্ড করে দেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশে গাছপালা, পশুপাখিসহ মানুষের জানমালের অপূরণীয় ক্ষতি করে। বিশেষ করে দেশের অমূল্য সম্পদ সুন্দরবন উপকূলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকার বন বিনষ্ট হয়। তবে সুন্দরবনের অবস্থানের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের বিশাল জনবসতি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়। সুন্দরবনই ঝড়ের গতিবেগ রোধ করে ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষা করে। বাঁচায় উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য মানুষকে। তা সত্ত্বেও উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্ব¡াসের কারণে ব্যাপক ফসলহানি, চিংড়ি প্রকল্প নষ্ট ও কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। বাধাগ্রস্ত হয় দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক অগ্রগতি।
বিশ্বজুড়ে অব্যাহতভাবে চলছে বনভূমি উজাড়, বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্প-কারখানার দূষণ। জীবনের স্থূল চাহিদা মেটাতে মানুষ গড়ে তুলছে সুরম্য ভবন, নিত্যনতুন অবকাঠামো। বাংলাদেশে এ ধরনের পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা অনেক দেশের চেয়ে বেশি। এখানে বনাঞ্চল, জলাধার ধ্বংস হয়ে গেছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণের হিড়িক পড়েছে, শিল্প-কারখানার দূষণ চলছে অবিরাম। দেশে বর্তমানে ভূমির পরিমাণ ১ কোটি ৪০ লাখ হেক্টর। এরই মধ্যে ১২ লাখ হেক্টর রয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৯০ থেকে ১০ বছর মেয়াদে সংরক্ষিত বনে গাছ কাটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপরও বৃক্ষ কর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বহুবার। কোনোক্রমেই বনভূমি থেকে কোনো গাছ কাটা যাবে না, এমনকি ঝড়ের কবলে অথবা মড়কে আক্রান্ত হয়ে বনাঞ্চলে যেসব গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, সেগুলোও কেউ সংগ্রহে নিতে পারবে না। সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনের গাছ কাটার ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের মেয়াদ আগামী ২০২২ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় গাছ কাটা থেমে থাকেনি কখনো। বাংলাদেশে এক শ্রেণির অসাধু প্রভাবশালী মহল তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে নানা প্রজাতির গাছপালা নিধন করে চলেছে। তাই বিপন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশের কাছে আজ অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে মানুষ। অথচ এই বিপন্ন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষ নিজেই অনেকটা দায়ী।
বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশ একসময় বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। সময়ের প্রয়োজনে মানুষ বনভূমি কেটে আবাসস্থল তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে নতুন করে অধিক পরিমাণ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উপরন্তু দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নগর অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে অবিরাম। মানুষের নিত্যনতুন চাহিদা মেটাতে তৈরি হতে থাকে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিল্প-কারখানা। আর এসব করতে গিয়ে ক্রমেই উজাড় হচ্ছে বনভূমি। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য যেখানে দেশের আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ রয়েছে ৮ থেকে ১০ শতাংশ মাত্র। অথচ বৃক্ষ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্পূর্র্ণ নির্ভরশীল প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য। এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হতে পারে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। কারণ বৃক্ষনিধনসহ নানা কারণে জলবায়ুর আমূল পরিবর্তন হচ্ছে, ফলে বন্যা ও খরার প্রবণতা বৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। উত্তাপ বৃদ্ধির ফলে হিমবাহের গলনে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি পাবে, পাশাপাশি পলি জমে সমুদ্রের তলদেশ ভরাট হয়ে যাবে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে। এই বেড়ে যাওয়া ১ মিটার হলেই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের আয়তনের ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ স্থল ভাগ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ ভাগ ভূমি সাগর জলে তলিয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
ইতিমধ্যে অতিরিক্ত জোয়ার এবং জলোচ্ছ্ব¡াসের কারণে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঢুকে ভূমির উৎপাদনক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে সুস্বাদু পানীর প্রাপ্যতা হ্রাস পেয়েছে, দ্রুত বেড়ে চলছে লবণাক্ততা। ঋতুচক্র পরিবর্তনের কারণে বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বাংলাদেশের অহংকার তথা বিশ্বের প্রধান ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের প্রায় ৫ হাজার প্রজাতির গাছের ১০৬টির অস্তিত্ব ইতিমধ্যে প্রায় বিলুপ্ত। ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ৩০ ভাগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। প্রাকৃতিক নিয়মেই উদ্ভিদ ও প্রাণী নিয়ে গঠিত যে জীববৈচিত্র্য তা একে অন্যের সাহায্য নিয়ে যেমনি বেঁচে থাকে তেমনি পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিতভাবে অবদান রাখে অসামান্য। তবু বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল, সমতল ভূমি এবং উপকূলীয় এলাকায় আজও রয়েছে বেশ কিছু বনাঞ্চল। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড় এলাকার বনে গর্জন, সেগুন, জারুল এবং গামারি জাতীয় বৃক্ষ পাওয়া যায়। দিনাজপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের বনাঞ্চলের নানা জাতের গাছপালাও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় অনেকটা সহায়তা করছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমে খুলনা ও পটুয়াখালী জুড়ে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবান দীর্ঘকাল ধরে দেশের জীববৈচিত্র্য তথা পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের বন দেশের বনভূমির প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে। এখানে প্রচুর সুন্দরী, গেওয়া এবং কেওড়াগাছ ছাড়াও রয়েছে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ ও নানা প্রজাতির বানর, যা এক বিরল দৃষ্টান্ত।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়ে দেশের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা করতে যে অধিকতর বনাঞ্চল সৃষ্টি করা অত্যাবশ্যক তা আজ বিশ্বস্বীকৃত। ব্যক্তিগত এবং সরকারী উদ্যোগে বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে পতিত জমি, নদী ও রাস্তার পাড়ে প্রচুর গাছ লাগানো দরকার। দেশের অরক্ষিত বিশাল চরাঞ্চলসহ উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বনাঞ্চল সৃষ্টি করে সবুজবেষ্টনী গড়ে তোলা জরুরি। সরকারি, বেসরকারি ও সমন্বিত উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন এবং রোপিত গাছপালার নিয়মিত পরিচর্যা দেশের বনজসম্পদ বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। উপকূলীয় বনভূমি সুরক্ষাসহ উপকূলীয় এলাকায় নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টি জোরদার করা হলে তা ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্ব¡াস ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে দেশকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে। পুরোনো বন সংরক্ষণ, নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টি এবং সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করে দেশের বনভূমিকে আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে উন্নীত করা অবশ্যই সম্ভব। জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন শীর্ষক এক সম্মেলনে প্রতিটি দেশে বনাঞ্চল বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘ন্যাশনাল ফরেস্ট্রি অ্যাকশন প্রোগ্রাম’ তৈরির আহ্বান জানানো হয় বেশ আগে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বনজসম্পদ রক্ষা, বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ‘ফরেস্ট্রি মাস্টার প্যান’ প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামীতে দেশের ভূমির ২০ শতাংশ বনায়নের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল। এই লক্ষ্যে বৃক্ষহীন অথচ বনভূমি হিসেবে চিহ্নিত ৭ লাখ ৫৮ হাজার একর জমিতে নতুন গাছ লাগানোর কথা হয়েছে।
সামনে আসছে বর্ষাকাল। আষাঢ়-শ্রাবণে সারা দেশে বৃক্ষমেলা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা জাতের বনজ ও ফলদগাছের চারা বিক্রি হতে দেখা যায়। শহরের ও গ্রামের নার্সারিগুলোতে কলম ও চারা কিনতে পাওয়া যায়। সম্প্রতি মানুষের মাঝে গাছ লাগানোর উৎসাহ লক্ষ করা গেছে। আজ রাজধানীসহ দেশের ছোট-বড় শহরের বাড়ির আঙিনায়, ভবনের ছাদে ফলদ বৃক্ষ শোভা পাচ্ছে। এসব গাছপালা পরিচর্যায় যথেষ্ট উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষি দপ্তরের সহযোগিতায় উন্নত প্রজাতির ফলদগাছে নানা রকম ফলমূল জন্মাতে দেখা যাচ্ছে। দেশি ফল- আম, পেয়ারা, লিচু ছাড়াও বিদেশি স্ট্রবেরি, তিন, ড্রাগন ফলের আবাদ লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ছাড়া নানা রকম শাকসবজি উৎপন্ন করে পরিবারের খাদ্যচাহিদা পূরণ করে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীকেও বিলাতে সক্ষম হচ্ছেন। এমনকি ভবনের ওপরের তলায় প্রখর সূর্যতাপে যে উষ্ণতার সৃষ্টি হয়, তার যন্ত্রণা থেকে ভবনে বসবাসকারীদের কিছুটা হলেও মুক্তি দিতে পারে। শুধু তা-ই নয়, বৃক্ষশূন্য এ শহরে ছাদণ্ডবাগানের আচ্ছাদন উষ্ণতা থেকে রক্ষা করে অক্সিজেন সরবরাহেও ভূমিকা পালন করছে। এ আগ্রহকে ধরে রাখতে হবে, বাড়াতে হবে গাছের সংখ্যা। বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষের মধ্যে পূর্ণবয়স্ক মানুষরা যদি প্রতি বছর একটি করে হলেও গাছের চারা বা কলম রোপণ করেন, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই গাছপালা, লতাগুল্মে ভরে যাবে দেশ। শ্যামলে ছেয়ে যাবে অপরূপ বাংলার পথ-প্রান্তর। মরুময়তা থেকে রক্ষা করে উদ্ভিদবৈচিত্র্যের অফুরন্ত সম্ভারে ভরে উঠবে আমাদের সোনালি স্বদেশ।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, প্রকৌশলী ও কলাম লেখক
"






































